বুধবার, 01 জুলাই 2015 14:26

পাম চাষ কেন গলার কাঁটা হইবে

ইত্তেফাক ।। অর্ধযুগ ধরিয়া পাম গাছ চাষ করিয়া শাঁখের করাতের মধ্যে পড়িয়াছেন পামচাষিরা। গত সোমবার ইত্তেফাকে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানা যায়, যশোরের কেশবপুর উপজেলার শত শত যুবক পামচাষি পড়িয়াছেন মহা বিপাকে। গত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে কৃষি বিভাগের পরামর্শে উৎসাহিত হইয়া বাণিজ্যিকভাবে পাম চাষাবাদ আরম্ভ করেন অনেকে। চারা রোপণান্তে সঠিক পরিচর্যার পর চার বৎসরের মধ্যেই ফল-সম্ভারে ভরিয়া উঠে পামগাছগুলি। আর বিপাক শুরু হয় তখন হইতেই। যে সকল এনজিও উদ্বুদ্ধ করিয়া যুবকদের পাম চাষে উৎসাহিত করিয়া জানাইয়াছিল, ফল তাহারাই ক্রয় করিবে, সেই এনজিওগুলি লাপাত্তা হইয়া গিয়াছে। শিল্প-উৎপাদন ও বিপণনে যে শৃঙ্খলা ও ব্যবস্থাপনা থাকা দরকার, তাহার ব্যত্যয় ঘটায় এসব উদ্যোগ কার্যত মাঠে মারা যাইতেছে। অবস্থাফেরে এই পাম গাছ এখন পরিণত হইয়াছে পামচাষিদের গলার কাঁটায়।
কয়েক বৎসর পূর্বে একই চিত্র দেখা গিয়াছে খাগড়াছড়ি, ঝিকরগাছা, নরসিংদীর রায়পুরা, মেহেরপুর, ঠাকুরগাঁও-সমেত বিভিন্ন অঞ্চলে। এসব অঞ্চলেও পামচাষির মাথায় হাত পড়িয়াছে উপরিউক্ত কারণে। দুঃখজনকভাবে এই অভিযোগ প্রায় সর্বত্রই রহিয়াছে যে, পামচাষিদের এই বিপাকে সেখানকার কৃষি সমপ্রসারণ অধিদপ্তর বিশেষ কোনো সহযোগিতা করিতে পারে নাই। মূলত সমগ্র দেশেই পাম চাষিরা তৈল প্রক্রিয়াকরণের কৌশল না জানিবার কারণে এইরূপ বিপাকে পড়িয়াছেন। অথচ ভোজ্যতৈল আমদানি নির্ভর বাংলাদেশের চাহিদা পূরণে যেমন পাম চাষের প্রয়োজন রহিয়াছে, তেমনই রহিয়াছে ইহার বিপুল বাণিজ্যিক সম্ভাবনা। বাংলাদেশে ভোজ্যতেল আমদানি খাতে ফি বৎসর ১২ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়। যে তেল আমদানি করা হয় তাহার ৬০ শতাংশই পাম তেল। তাই পাম তৈল উৎপাদন ও তাহার জন্য যথোপযুক্ত কলকারখানা স্থাপন করা সম্ভব হইলে বৈদেশিক মুদ্রারও সাশ্রয় সম্ভবপর হইত। বিশ্বে এখন পরিবেশ ভারসাম্য রক্ষায় ‘শূন্য বর্জ্য ও শূন্য দহন’ পদ্ধতি চালু করা হইতেছে। পাম গাছ বলা যায় সেই পরিবেশ ভারসাম্যের জন্য একটি আদর্শ প্রজাতির উদ্ভিদ। এই গাছের পাতা, গুঁড়ির শূন্য কাঁদি ব্যবহার করিয়া বিভিন্ন দ্রব্য উৎপাদন করা যায়। পাতা ও ডাল না পুড়াইয়া সার হিসাবে ব্যবহার করা যায়। পাম গাছের এক টন পাতা মাটিতে ৭.৫ কেজি নাইট্রোজেন, ১ কেজি ফসফরাস, ৯.৮১ কেজি পটাসিয়াম ও ২.৭৯ কেজি ম্যাগনেসিয়াম ফিরাইয়া দেয়। এবং এই গাছ বাতাস হইতে প্রচুর পরিমাণে কার্বন-ডাই-অক্সাইডও গ্রহণ করিয়া থাকে। এই বর্ষজীবী উদ্ভিদটি রোপণের আড়াই হইতে তিন বৎসরের মধ্যেই ফলন দেওয়া শুরু করে। ২৫ বৎসর অবধি তাহা অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক থাকে এবং হেক্টর প্রতি সর্বোচ্চ ৫ টন তৈল পাওয়া যায়। বাণিজ্যিকভাবে চাষকৃত যেকোনো ভোজ্যতৈল অপেক্ষা পাম তৈলের প্রাপ্যতা ৫ হইতে ১০ গুণ বেশি। বাংলাদেশের মাটিও পামচাষের উপযোগী।
পাম চাষের জন্য ইতোপূর্বে গৃহীত পদক্ষেপ ফলপ্রসূ না হইলেও বর্তমানে নূতন করিয়া ভাবিবার সময় আসিয়াছে। কৃষি জমি ব্যবহার না করিয়াও আমাদের দেশে প্রতিটি গৃহকোণে পাম চাষ করা সম্ভব। কিন্তু পাম ফল হইতে সঠিক প্রক্রিয়ায় তৈল নিষ্কাশনের ব্যবস্থা এখনো করা যায় নাই, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করা হইতেছে না। তাই, আমাদের দেশে পরিকল্পিতভাবে পাম চাষের উদ্যোগ গ্রহণ করা হইলে একদিকে যেমন পাঁচ বৎসরের মধ্যে দেশের ভোজ্যতৈল চাহিদা মিটানো সম্ভব, অন্যদিকে দেশের অর্থনীতি লাভবান হইবার পাশাপাশি গড়িয়া উঠিতে পারে শ্রমঘন পামতৈল শিল্প। সুতরাং পামচাষ লইয়া কার্যকর পরিকল্পনায় আর বিলম্ব নহে।

এই ক্যাটেগরিতে অন্তর্ভুক্ত: « খাদ্যনিরাপত্তার সারথি সারা দেশে গম আতঙ্ক »