বুধবার, 01 জুলাই 2015 14:50

সারা দেশে গম আতঙ্ক

বণিক বার্তা ।। পচা ও নিম্নমানের গম নিয়ে সারা দেশে ভোক্তাদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। ব্রাজিল থেকে আমদানিকৃত নিম্নমানের গম হাতবদল হয়ে দেশের বিভিন্ন বাজারে চলে যাওয়ার পর এ আতঙ্ক দানা বাঁধছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ব্রাজিল থেকে আমদানিকৃত পচা গম পুলিশ, আনসারসহ বিভিন্ন বাহিনীর সদস্যদের মধ্যে সরবরাহ করা হয়। গমের মান নিয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে অসন্তোষ প্রকাশ করা হয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গমের মান নিয়ে পুলিশের আপত্তির কথা তুলে ধরে খাদ্য মন্ত্রণালয়কে গত দুই মাসে একাধিকবার চিঠি দিয়েছে। নিম্নমানের এসব গম টেস্ট রিলিফ (টিআর), কাজের বিনিময়ে খাদ্য (কাবিখা) ও বিভিন্ন প্রকল্পে সরবরাহের পর হাতবদল হয়ে দেশের বিভিন্ন বাজারে ঢুকে পড়েছে। সংশ্লিষ্টরা জানান, এসব গম মিল মালিকদের কাছে বিক্রি করা হয়েছে। পরে তা আটা হয়ে বাজারে চলে আসছে।
গতকাল পুলিশ সদর দফতরের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বণিক বার্তাকে বলেন, খাদ্য অধিদফতর থেকে সরবরাহকৃত গম খাওয়ার উপযোগী নয়। দেশের যেসব জেলায় এ গম সরবরাহ করা হয়েছে, সেখান থেকে লিখিত প্রতিবেদনে মানের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। প্রত্যেক জেলা থেকেই ব্রাজিল থেকে আনা গমের ব্যাপারে আপত্তি তোলা হয়েছে। সেনা, বিমান ও নৌবাহিনী সদস্যদের মধ্যে যে প্রক্রিয়ায় গম সরবরাহ করা হয়, তা অনুসরণ করে পুলিশ সদস্যদের মধ্যে সরবরাহের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়েছে।
রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে আটা-ময়দার মিল মালিকরা জানান, ব্রাজিল থেকে যে মানের গম এসেছে, তা সংশ্লিষ্ট দেশে গো-খাদ্য হিসেবেও ব্যবহার করা হয় না। মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে এসব নিম্নমানের গম খালাসের অনুমোদন দেয়া হয়েছে। একশ্রেণীর মিল মালিক এসব নিম্নমানের গম কিনে আটা তৈরি করে তা বাজারজাত করছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ব্রাজিল থেকে আমদানিকৃত গম ভাঙার পরিমাণ ছিল অনেক বেশি। এছাড়া এতে আর্দ্রতার পরিমাণও তুলনামূলক অনেক কম। ২৮ জুন বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদের (বিসিএসআইআর) অধীন খাদ্যবিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ইনস্টিটিউটের প্রতিবেদনে বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনে দেখা গেছে, গমে ভাঙা অংশের গ্রহণযোগ্য মাত্রা রয়েছে ৫ থেকে সর্বোচ্চ ৮ শতাংশ। কিন্তু ব্রাজিল থেকে আমদানিকৃত গমে ভাঙা অংশ পাওয়া গেছে ৯ দশমিক ৯৩ থেকে সর্বোচ্চ ২১ দশমিক ১১ শতাংশ। এছাড়া গমে আর্দ্রতা থাকার মাত্রা ১৩ দশমিক ৫ শতাংশ। কিন্তু অধিকাংশ নমুনায় আর্দ্রতা পাওয়া গেছে ৯ দশমিক ৬১ থেকে ১১ দশমিক ৮৪ শতাংশ। ফলে গম থেকে আটাও হচ্ছে কম। প্রতি ১০০ কেজি গম থেকে ৭৫ কেজি আটা হওয়ার কথা থাকলেও কোনো কোনো ক্ষেত্রে ৭০ কেজির নিচে আটা পাওয়া যাচ্ছে।
তবে ২৮ জুন খাদ্য মন্ত্রণালয়ের উপসচিব মো. কাউসার আহাম্মদ স্বাক্ষরিত এক বার্তায় জানানো হয়, আমদানিকৃত গমের চুক্তির শর্ত মোতাবেক মান নির্ণয়ের জন্য নয়টি প্যারামিটার রয়েছে। ব্রাজিল থেকে ফেব্রুয়ারি-মার্চে আমদানিকৃত গম ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করার পর খাদ্য অধিদফতর তা গ্রহণ করে। খাদ্য অধিদফতরের ল্যাবরেটরিতে পুনরায় নমুনা পরীক্ষা করে গমের মান সম্পর্কে কোনো বিরূপ তথ্য পাওয়া যায়নি। এছাড়া ওই গমের নমুনা বিসিএসআইআরের (সায়েন্স ল্যাবরেটরি) গবেষণাগারে বিনির্দেশ অনুযায়ী প্যারামিটারগুলো পরীক্ষা করেও কোনো বিরূপ তথ্য পাওয়া যায়নি।
নারায়ণগঞ্জ জেলা আটা-ময়দা মিল মালিক সমিতির সাবেক সভাপতি ওয়াজেদ আলী বাবুল বণিক বার্তাকে বলেন, টিআর, কাবিখা ও অন্যান্য প্রকল্পের গম অধিকাংশই বাজারে চলে আসে। এসব গম কম দামে কিনে আটা তৈরি করেন দেশের অনেক মিল মালিক। তবে সমিতির বর্তমান সভাপতি মতিউর রহমান দাবি করেন, সুনাম রক্ষার্থে তাদের এলাকার মিল মালিকরা নিম্নমানের গম ব্যবহার করেন না।
সাতক্ষীরা প্রতিনিধি জানান, ব্রাজিল থেকে নিম্নমানের গম আমদানি করায় বাজারে গমের চাহিদা কমে গেছে। এতে ব্যবসায়ীরা লোকসানের মুখে পড়েছেন। অন্য যেকোনো সময়ের তুলনায় সম্প্রতি গমের চাহিদা বাজারে সবচেয়ে কম।
খুলনা প্রতিনিধি জানান, ব্রাজিল থেকে আমদানি করা নিম্নমানের গম খোলাবাজারে বিক্রি (ওএমএস) ও টেস্ট রিলিফ (টিআর) প্রকল্পে সরবরাহ করা হয়েছে। নগরীর মহেশ্বরপাশা কেন্দ্রীয় খাদ্য সংরক্ষণাগারে গিয়ে দেখা যায়, বিভাগের বিভিন্ন জেলায় গম পাঠানোর জন্য সিএসডির গুদামের বস্তার মুখ খুলে দেখা গেছে বস্তায় যে গম রয়েছে, তা খাওয়ার অযোগ্য।
সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, ব্রাজিল থেকে আমদানি করা দুই লাখ টন গমের মধ্যে প্রায় ৮০ হাজার টন খালাস করা হয়েছে খুলনার মংলা বন্দর দিয়ে। এর মধ্যে ৪৫ হাজার টন গম খুলনা বিভাগ ও বৃহত্তর ফরিদপুরে সরবরাহ করা হয়েছে। বাকি ৩৫ হাজার টন বরিশাল বিভাগে সরবরাহ করা হয়েছে।
খাদ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক ২১ জুন খাদ্য মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়ে জানিয়েছিলেন, ব্রাজিল থেকে আনা গম সরকারের আমদানি শর্তের প্রান্তসীমায় ছিল। আর নিম্নমান হওয়ায় খাদ্য বিভাগ থেকে মে মাসে গমের একটি জাহাজ ফেরত পাঠানো হয়েছিল। খাদ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, খাদ্য অধিদফতর পুলিশ বাহিনীকে ব্রাজিল থেকে আনা গম সরবরাহ না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।