সোমবার, 31 অগাস্ট 2015 11:37

ভেসে গেছে কৃষি-নায়কদের স্বপ্ন

উত্তরের কথন

রংপুরের মানুষের জন্য না আছে প্রাকৃতিক আনুকূল্য, না সরকারের বিশেষ চেষ্টা। তবে কি অভাবী রংপুরের অভাবের রেখা বন্যায় দীর্ঘ হতেই থাকবে?

প্রথম আলো || উত্তরাঞ্চলে প্রায় প্রতিবছরই বন্যা হয়। বন্যায় সবুজ শস্য-ঘরবাড়ির সঙ্গে ডুবে যায় কৃষকের সোনালি স্বপ্ন। ব্রিজ-কালভার্টের মুখ বন্ধ করে পানির পথরোধ করায় সামান্য বৃষ্টিতেই বন্যা দেখা দেয়। একসময় অনেক নদী ছিল, যে নদীগুলো দিয়ে বৃষ্টির পানি দ্রুত নেমে যেত। এখন সেসব নদী কোথাও বিলে পরিণত হয়েছে, কোথাও বা নিশ্চিহ্ন। তা ছাড়া, যে নদীগুলো আছে, সেগুলো খনন না করার কারণে একটু পানিতেই দুই কূল ভেসে যায়। আর যদি হয় ঘন বর্ষণ এবং সেই সঙ্গে উজানি ঢল নামে, তাহলে বন্যার ভয়াবহতা চরম মাত্রায় পৌঁছায়। চলতি বছর উত্তরাঞ্চলে দুবার বন্যা হলো। যদি ব্রিজ-কালভার্টগুলো দখলদারদের থেকে মুক্ত থাকত এবং নদীগুলোর প্রতি সরকার যত্নবান হতো, তাহলে প্রথমবারের বন্যা হয়তো হতো না। এমনকি বর্তমানে যে বন্যা চলছে, সেই বন্যাও এতটা ভয়াবহ রূপও নিয়ে আসত না।
গত মৌসুমে এখানকার কৃষক ধানের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হয়েছে। ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’-এর মতো তাদের ওপর বন্যা এসে পড়েছে। আমন মৌসুমে ধান উৎপাদনে ব্যয় অনেক বেশি। সেই সময়ে ধানের দাম ছিল অনেক কম। ধানচাষিরা অপেক্ষায় ছিল আউশ উৎপাদনে খরচ কম থাকে, তখন ক্ষতি কিছুটা পোষানোর ব্যবস্থা হবে। কিন্তু প্রথম দফায় বন্যায় তারা অনেকটাই ক্ষতিগ্রস্ত হলেও নতুন করে বীজ রোপণ করে এবং দ্বিতীয় দফায় আবার ধানের চাষ করে। সেই ধানখেতও কয়েক দিন ধরে দ্বিতীয়বারের বন্যায় পানির নিচে। যদি পানি দ্রুত নেমে যাওয়ার ব্যবস্থা থাকত তাহলে বৃষ্টি শেষ হওয়ার অল্প সময়ের মধ্যেই পানি নেমে যেত। তখন ধান নষ্ট হতো না। যেহেতু ব্রিজ-কালভার্টের মুখ বন্ধ, তাই কয়েক দিন আগে বৃষ্টি বন্ধ হলেও এখনো নেমে যায়নি সে পানি। এ মৌসুমে নতুন করে বীজ রোপণ করে ধান চাষের আর সুযোগও নেই।
বন্যার সময়ে কয়েক রকম সংকট তীব্র আকারে দেখা দেয়। যখন বন্যার পানি বাড়তে থাকে তখন ঘরবাড়ি ডুবে গেলে গবাদিপশুসহ মানুষের কোথাও আশ্রয় পাওয়া খুবই কঠিন হয়ে পড়ে। আমাদের দেশে প্রতিবছর একবার/দুবার বন্যা হলেও সেই বন্যার্ত ব্যক্তিদের জন্য কোনো নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রের ব্যবস্থা করা হয় না। যখন বন্যার পানি নামতে থাকে, তখন নদীর পাড়ও ভাঙতে থাকে। পাড় ভাঙা রোধের তখন আর কোনো উপায় থাকে না। যদি শুষ্ক মৌসুমে নদীর তীর শক্ত করে বেঁধে দেওয়ার ব্যবস্থা করা যেত, তাহলে পাড় ভাঙত না। যেমনটি কোথাও কোথাও করা হয়েছে। যখন বন্যা শেষ হয় তখন দেখা দেয় পানিবাহিত রোগ। পানিবাহিত রোগের জন্য বন্যা-পরবর্তী যে পরিমাণ চিকিৎসা-সহযোগিতা থাকার কথা, সে পরিমাণ চিকিৎসা-সহযোগিতা পাওয়া যায় না। বন্যায় রংপুর থেকে গিয়েছিলাম কুড়িগ্রাম। যাওয়ার পথে চোখে পড়ল দুই দিকে শুধু পানি আর পানি। ডুবে আছে গাছ-বাড়িঘর—সবকিছুই। যেসব জায়গায় এখন সবুজ ধানের খেত দেখা যাওয়ার কথা, সেখানে নদীর মতো জলরাশি। রংপুরের বড় দরগাহ থেকে খালাসপীর এলাকায় যাওয়ার সময়ও দেখা গেল একই চিত্র। এবারের বন্যা-পরিস্থিতি আমাকে মনে করিয়ে দিল গত বছরের বন্যার সময়ের কথা। একজন দানবীরের ১৫-১৬ লাখ টাকার ত্রাণ দেওয়ার জন্য গিয়েছিলাম ব্রহ্মপুত্রের চরে। প্রতিটি চরেই অসংখ্য মানুষের ভিড় ছিল। তুলনামূলক যারা বেশি অভাবী তাদেরই আমরা দিয়েছিলাম ত্রাণ। সেই ত্রাণ প্রতিটি চরেই এতটাই অপ্রতুল ছিল যে সেখান থেকে ফেরার সময়ে অসংখ্য নারী-পুরুষের আহাজারি শুনতে হয়েছে। 

এই ক্যাটেগরিতে অন্তর্ভুক্ত: « সারা দেশে গম আতঙ্ক কৃষি জমিতে ইটভাঁটি »