সোমবার, 18 এপ্রিল 2016 12:21

কৃষি জমিতে ইটভাঁটি

দৈনিক জনকন্ঠ || দেশে বছরে মাটি পোড়ানো ইট কিনতে গুনতে হচ্ছে কম পক্ষে নয় হাজার কোটি টাকা। আর বিপুল পরিমাণ এই পণ্য তৈরিতে নষ্ট হচ্ছে কৃষি জমি। অথচ এসব জমি থেকে মাটি সংগ্রহের ক্ষেত্রে আইনী নিষেধাজ্ঞা থাকলেও তা মানছে না কেউ। এজন্য বলা হচ্ছে আইনের নানা দুর্বলতার কথা। আবার কারও পরামর্শ কৃষি জমি নষ্ট না করে, ইট আমদানির দিকে নজর বাড়ানোর। দেশে বছরে যে পনেরো শ’ কোটি ইট তৈরি হচ্ছে তার বেশিরভাগের জন্যেই মাটি আনতে হচ্ছে কৃষি জমি খাল কিংবা পাহাড় কেটে। যার পরিমাণ প্রায় এক শ’ ষাট কোটি ঘনফুট। অথচ ইটের চাহিদা আরও কম। তবে বছরে এক শতাংশ হারে নষ্ট হওয়া কৃষি জমির অর্ধেকই যাচ্ছে নতুন বাড়িঘর তৈরিতে। আর ষোল শতাংশ নষ্ট করছে ইটভাঁটিগুলো। অথচ আইনে মাটি সংগ্রহের ব্যাপারে কড়া নিষেধাজ্ঞা থাকলেও তা মানছে না ভাঁটি মালিকরা। দেশের নির্মাণ সামগ্রীর অন্যতম প্রধান উপাদান হলো মাটি পোড়ানো ইট। যা কিনতে বছরে খরচ হচ্ছে প্রায় নয় হাজার কোটি টাকা। দেশে বর্তমানে ইটভাঁটির সংখ্যা প্রায় সাড়ে আট হাজার। এর প্রায় সত্তর শতাংশই অবৈধ। যেখানে কোন ধরনের নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে কাঠ। যদিও কয়লা পোড়ানোর আইনগত নির্দেশ থাকলেও সুযোগ পেয়ে কাঠ পোড়ানো হচ্ছে। ভাঁটি মালিকদের সামাজিক অবস্থান এবং রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় গড়ে উঠেছে এসব অবৈধ ইটভাঁটি। যা আইনের তোয়াক্কা না করে স্থাপন করা হয়েছে লোকালয়, কৃষি জমি, পাহাড়ের ঢালে এবং বনাঞ্চলের আশপাশে। আবার কোথাও অবৈধভাবে কৃষি জমি এবং লোকালয়ে স্থাপন করা হয়েছে ইটভাঁটি। জমির উপরিভাগের দশ থেকে পনেরো ইঞ্চির মধ্যে থাকে পলিমাটি। যাকে বলা হয় মাটির প্রাণ। মাটি কাটার ফলে কমে যায় জমির উর্বরা শক্তি; যা পঞ্চাশ বছরেও পূরণ করা সম্ভব নয়। দেশে চাহিদানুযায়ী ইট প্রস্তুত করতে ১২৭ কোটি সিএফটি মাটির দরকার হয়। যার বেশিরভাগই কৃষি জমির উপরি ভাগ থেকে সংগৃহীত। ইট প্রস্তুতখ্যাত দেশের গ্রীন হাউস গ্যাসের সবচেয়ে বড় উৎস। এখাতে বছরে ২২ লাখ টন কয়লা ও ১৯ লাখ টন জ্বালানি কাঠ পোড়ানো হয়। যা বছরে ৮৮ লাখ টন গ্রীন হাউস গ্যাস নিঃসরণ করে। ফসলি জমিতে ইটভাঁটি চালু করায় এর বিষাক্ত ধোঁয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে জমির ফসল। ইট যেহেতু পোড়াতে হয় দীর্ঘক্ষণ ধরে উত্তপ্ত আগুনে। তাই আশপাশের জমির পানি যায় শুকিয়ে এবং ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নামতে থাকে নিচে। আর প্রতিবছর কার্বন ডাই অক্সাইড নির্গত হয় সাত লাখ টন। বর্তমানে যে হারে বন উজাড় করে ভাঁটি তৈরি হচ্ছে, তা পরিবেশবিরোধী। কমে যাচ্ছে কৃষি জমি এই অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন ইট তৈরির বিকল্প পথের সন্ধান। ইটভাঁটিতে বায়ুদূষণমুক্ত ইট তৈরির প্রযুক্তি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। মাটির ইটের পরিবর্তে বিকল্প ইট তৈরি করতে হবে। সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা অনুযায়ী ইট তৈরিতে মাটির ব্যবহার ২০২০ সালের মধ্যে শূন্যের কোটায় নামিয়ে আনার পরিকল্পনা করা হয়েছে। নদী খনন থেকে ওঠে আসা বালু দিয়ে ইটের বিকল্প উপকরণ দিয়ে ভবন নির্মাণ কাজ করা যেতে পারে। সরকারী বিভিন্ন কাজে ইটের বিকল্প হিসেবে প্রস্তুত হওয়া উপকরণ ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেয়া সঙ্গত। ইটভাঁটির কারণে যে ভূমিক্ষয় হচ্ছে, তা রোধের উপায় বের করতে হবে। প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য বজায়ের জন্য কৃষি জমিসহ মাটির ব্যবহার রোধ করতে হবে। অন্যথায় ভয়াবহ বিপর্যয় অসম্ভাবী। এর থেকে পরিত্রাণ জরুরী।