সোমবার, 18 অগাস্ট 2014 12:04

খাস জমি নিয়ে কাড়াকাড়ি

দৈনিক সমকাল ।। অবৈধ দখলে রয়েছে দেশের ১৩ লাখ একরের বেশি খাস জমি। এর মধ্যে ৮ লাখ একরের বেশি কৃষি খাস জমি প্রভাবশালীদের দখলে রয়েছে। খাস জমি বন্দোবস্ত দেওয়ার ক্ষেত্রেও চলছে অব্যবস্থাপনা। প্রকৃত ভূমিহীনদের খাস জমি বন্দোবস্ত পাওয়ার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকারের বিধান থাকলেও বাস্তবে কমসংখ্যক ভূমিহীনই সরকারের এ সুবিধা ভোগ করছেন। যাদের খাস জমি পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই তারাই খাস জমি নিয়ে কাড়াকাড়ি করছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে সরকারের অধীনে থাকা খাস জমি প্রকৃত ভূমিহীনদের মধ্যে বরাদ্দ দিলে পরিবার প্রতি ২ দশমিক ৩ একর করে দেওয়া সম্ভব।
খুলনা জেলার সুন্দরবনসংলগ্ন কয়রা উপজেলাধীন নারায়ণপুরের প্রায় ৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য ২০০ ফুট প্রস্থ ৮০ একরের সরকারি খাস জলাশয় একটি প্রভাবশালী মহলের দখলে। অথচ এসব জমি প্রান্তিক ক্ষুদ্র মাছ চাষিদের মধ্যেই বিতরণের কথা। কৌশলে কিছু অংশ বৈধ ইজারা নিয়ে সিংহভাগই খাস জলাশয় আটকে বছরের পর বছর 'মাছের ঘের' করছেন প্রভাবশালীরা। সাম্প্রতিক কয়রা নদীর পাশে জেগে ওঠা খাস জমিও তাদের দখলে চলে গেছে। তারা রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে এসব খাস জলাশয় ভোগদখল করছেন। এ চিত্র শুধু খুলনায় নয়- ঢাকা, চট্টগ্রামসহ সারাদেশে আবাদযোগ্য কৃষি ও অকৃষি লাখ লাখ একর সরকারি জমি প্রভাবশালীরা ভোগদখল করছেন। সমকাল প্রতিনিধিরা এ সম্পর্কিত বিস্তারিত সংবাদ পাঠিয়েছেন।
রাজধানীর প্রাণকেন্দ্র মতিঝিলে সরকারের খাস জমিতে গড়ে তোলা হয়েছে একটি হোটেল। ১৯৬০ সালে জমিটি বন্দোবস্ত দেওয়া হলেও ১৯৬৫ সালে তা হাতবদল হয়ে যায় ওই হোটেল কর্তৃপক্ষের কাছে। ১৯৬৮ সালে সেখানে গড়ে তোলা হয় একটি তিন তারকা হোটেল। ২০১৩ সালে ভূমি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়। জমিটি উদ্ধারে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষকে (রাজউক) প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়। ঢাকার অদূরে সাভারে ২৩০ পরিবারের কাছে বন্দোবস্ত দেওয়া ৮০ দশমিক ২৬ একর খাস জমিও চলে গেছে প্রভাবশালীদের দখলে।
অন্যদিকে পুরান ঢাকার ধোলাইখাল এলাকায় প্রধান সড়ক নির্মাণের সময় ১৩৮টি ভূমিহীন পরিবারকে প্রায় ২০ একর খাস জমি বন্দোবস্ত দেওয়া হয়। কৃষি জমি হিসেবে তাদের বরাদ্দ দেওয়া হলেও পুরনো গাড়ির যন্ত্রাংশের বাজার, আবাসন ও বাণিজ্যিক ভবনও গড়ে উঠেছে এখানে। গাজীপুর সদর উপজেলার কাশিমপুর মৌজার ১ দশমিক ৩৪ একর খাস জমি দীর্ঘমেয়াদি বন্দোবস্ত নেওয়ার চেষ্টা করছে একটি শিল্প প্রতিষ্ঠান। ভূমি রেকর্ড পরিবর্তন করে এটি নদী থেকে খাস জমিতে রূপান্তরও করা হয়েছে। এখন তা বন্দোবস্ত নেওয়ার চেষ্টা চলছে। সীমানার দেয়াল দিয়ে এরই মধ্যে দশমিক ৭২ একর দখলে নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। বাকি জমিও নিতে ভূমি মন্ত্রণালয়ে আবেদন করা হয়েছে। ভূমি মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটি এর পক্ষে মত দিলেও রেকর্ড পরিবর্তন করে জমি বন্দোবস্তের আবেদনের বিপক্ষে মত দিয়েছেন ভূমি প্রতিমন্ত্রী। ভূমি মন্ত্রণালয় সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
ভূমি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে কৃষি খাস জমি ১১ লাখ ৫১ হাজার ১৩৬ একর। অকৃষি খাস জমির পরিমাণ ৬ লাখ ৯২ হাজার ৫৬৮ একর। সব মিলিয়ে কৃষি ও অকৃষি খাস জমির পরিমাণ ১৮ লাখ ৪৩ হাজার ৭০৪ একর। বন্দোবস্তযোগ্য কৃষি খাস জমির পরিমাণ ৩ লাখ ৪৯ হাজার ৬৩০ একর এবং বন্দোবস্তযোগ্য অকৃষি খাস জমির পরিমাণ ১ লাখ ৭ হাজার ৯৩৩ একর। সব মিলিয়ে বন্দোবস্তযোগ্য কৃষি ও অকৃষি খাস জমির পরিমাণ ৪ লাখ ৫৭ হাজার ৫৬৩ একর।
কৃষি খাস জমি ব্যবস্থাপনা ও বন্দোবস্ত নীতিমালা অনুযায়ী, শুধু ভূমিহীন পরিবার খাস জমি বরাদ্দ পাবে। প্রতি একর বা তার অংশের জন্য ১ টাকা প্রতীকী মূল্যে ৯৯ বছরের জন্য এসব জমি বন্দোবস্ত দেওয়া হয়। ৯৯ বছরের আগে তা কোনোভাবেই বিক্রি বা হস্তান্তরযোগ্য নয়। নীতিমালায় আরও উলেল্গখ রয়েছে, ভূমিহীন পরিবার বলতে কৃষির ওপর নির্ভরশীল কৃষি জমিহীন পরিবারকে বোঝাবে। এ ছাড়া বসতভিটাহীন, দুস্থ মুক্তিযোদ্ধা ও নদী ভাঙনকবলিত পরিবারও ভূমিহীন পরিবার হিসেবে এসব জমি পাওয়ার অধিকারী হবে। তবে বরাদ্দপ্রাপ্ত ব্যক্তি ভূমিহীন নয় প্রমাণিত হলে বন্দোবস্ত বাতিল করা হবে। অথচ বাস্তবে তা প্রতিপালন হচ্ছে না। প্রভাবশালীরাই জেলা প্রশাসনের অসাধু কর্মকর্তাদের সহায়তায় ভূমিহীন সেজে নিজেদের নামে এসব খাস জমি বন্দোবস্ত নিচ্ছেন।
জেলা প্রশাসক অফিস ও এসিল্যান্ড অফিসের একশ্রেণীর কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশ এবং লেনদেনের মাধ্যমে রাজনৈতিক নেতা, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও প্রভাবশালীরা বছরের পর বছর দখল করে রেখেছেন, যা পরবর্তীতে স্থানীয় ভূমি অফিস, রেজিস্ট্রি অফিস ও প্রশাসনের সহায়তায় দলিল এবং খতিয়ান জাল করে অনেকেই জমির স্থায়ী মালিক বনে গেছেন। এ টাকার ভাগ স্থানীয় পর্যায় থেকে জেলা প্রশাসন পর্যন্ত যাচ্ছে।
সরকারি অকৃষি জমির পাশাপাশি কৃষি জমিও দখলে রেখেছে প্রভাবশালী মহল। মামলার মারপ্যাঁচে প্রায় ৬০ হাজার একর কৃষি জমি দখলে রেখেছেন তারা। এর মধ্যে গাজীপুরের ভাওয়াল রাজ ও কোর্ট অব ওয়ার্ডসের জমি অন্যতম। এ জমির মূল্য কয়েক হাজার কোটি টাকা হলেও তা উদ্ধার এখন কার্যত কঠিন হয়ে পড়েছে। এ ছাড়া পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলায় একটি মহল পাহাড় কেটে কয়েক হাজার একর জমি দখল করে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করছে। পাহাড়ে খাস জমির সমস্যা আরও প্রকট।
সূত্র জানায়, দেশে বর্তমানে প্রায় ২০ হাজার একর অকৃষি খাস জমি প্রভাবশালীদের দখলে রয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এসব মূল্যবান সরকারি সম্পত্তি নিয়ে উচ্চ আদালতে মামলা চলছে। যথাযথ ভূমিকার অভাবে মামলায় সরকার হেরে যাচ্ছে। ভূমি প্রশাসনের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা সরকারের চেয়ে প্রভাবশালীদের স্বার্থ দেখছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। নীলফামারী জেলার ডোমারের আরেক ভূমিহীন কৃষক শেখ মানিক জানালেন, 'একযুগ আগে সরকারের খাস জমি বরাদ্দ পেলেও এখনও দখল বুঝে পাননি। তারা প্রভাবশালী হওয়ায় উল্টো তার নামে মিথ্যা মামলা দিয়েছে। প্রশাসনের বিভিন্ন লোকের কাছে ধরনা দিয়েও কোনো কাজ হচ্ছে না।'
চলতি মাসের মধ্যে দেশের প্রতিটি উপজেলায় ৪৮টি করে মোট ২১ হাজার ভূমিহীন পরিবারকে খাস জমি দিতে বিভাগীয় কমিশনারদের চিঠি দিয়েছে ভূমি মন্ত্রণালয়। খাস জমি বরাদ্দের এই সুযোগ নিচ্ছেন স্থানীয় বৃত্তশালীরা। প্রকৃত ভূমিহীনরা খাস জমি বরাদ্দের জন্য নেতাদের পিছু পিছু ঘুরেও লাভ হচ্ছে না। তবে ভূমিমন্ত্রী শামসুর রহমান শরীফ বলেছেন, প্রকৃত ভূমিহীন ছাড়া কাউকে খাস জমি বরাদ্দ দিলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বেসরকারি সংস্থা এএলআরডির নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা বলেন, দেশের মোট খাস জমির প্রায় ২৫ শতাংশই জলা ভূমি। ৩২ শতাংশ জমি হচ্ছে কৃষি। অবশিষ্ট জমি বর্তমানে কারও না কারও দখলে রয়েছে। স্থানীয় প্রভাবশালী ও ভূমিদস্যুদের জন্য এসবের ওপর দরিদ্র মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হচ্ছে না। তিনি খাস জমির ব্যবস্থাপনা দ্রুত ডিজিটালাইজড করার তাগিদ দেন।
এ বিষয়ে ভূমি প্রতিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী বলেন, আবাসন কোম্পানিগুলো নানা কৌশলে বিভিন্ন জেলায় খাস জমি দখল করে নিয়েছে। সহজে জমি পেতে শিল্প মালিকরাও অনেক সময় ভূমিহীনদের ব্যবহার করছেন। বিষয়টি খতিয়ে দেখার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কোনো ত্রুটি পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. আবুল বারকাতের মতে, দেশে কমপক্ষে ২ কোটি বিঘা খাস জমি রয়েছে। গ্রামে ভূমিহীন পরিবার রয়েছে প্রায় ১ কোটি। সঠিক বণ্টনের মাধ্যমে প্রত্যেক ভূমিহীন পরিবারকে ২ বিঘা খাস জমি দেওয়া সম্ভব। এ হিসাব বাদ দিলেও দেশে এ পর্যন্ত যে পরিমাণ খাস জমি পাওয়া গেছে তা দিয়েই প্রত্যেক ভূমিহীন পরিবারকে দশমিক ৫৫ একর করে খাস কৃষি জমি এবং খাস জলাভূমি দেওয়া সম্ভব বলে তিনি মনে করেন। আর সব ধরনের খাস জমি মিলিয়ে প্রত্যেক ভূমিহীন পরিবার পেতে পারে ২ দশমিক ৩ একর।
গত মহাজোট সরকারের আইন প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম বলেন, 'কৃষকদের মধ্যে খাস জমি সঠিকভাবে বণ্টনের ক্ষেত্রে নীতিমালা রয়েছে। এ নীতিমালা বাস্তবায়নে রাজনৈতিক নেতৃত্বই বাধা। বেশির ভাগ আবাসন প্রতিষ্ঠান রাজনৈতিক নেতৃত্বের সহায়তায় ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে খাস জমির একটা বড় অংশ দখল করে আছে। অনেক সময় সহকারী কমিশনারও ভূমিদস্যুদের সহায়তা করেন।
ভূমিমন্ত্রী শামসুর রহমান শরীফ সমকালকে বলেন, 'অবৈধভাবে যারা খাস জমি দখল করে রেখেছেন, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে সরকার। এ জন্য সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসনকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।' তিনি বলেন, ভূমি ব্যবস্থাপনায় দুর্নীতি বন্ধে ডিজিটাল পদ্ধতি চালু করা হচ্ছে। এটি চালু হলে ভূমি সংক্রান্ত মাঠপর্যায়ে দুর্নীতি কমে যাবে।