সোমবার, 25 অগাস্ট 2014 13:25

ঠাকুরগাঁওয়ে ভূমিদস্যুদের কবলে অর্ধশতাধিক ভূমিহীন পরিবার

সমকাল || খাসজমি দখলকে কেন্দ্র করে ঠাকুরগাঁওয়ে ভূমিদস্যুদের কবলে অর্ধশতাধিক ভূমিহীন পরিবার। জেলার পীরগঞ্জ উপজেলার বৈরচুনা ইউনিয়নের খেকিডাঙ্গী গ্রামে এ সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। ওই জমি দখলের জন্য বসবাসকারী ভূমিহীন পরিবারগুলোর ওপর নির্যাতনের অভিযোগও পাওয়া গেছে। শুধু একটি জমি নয়, এ জেলার পীরগঞ্জ উপজেলাসহ বিভিন্ন স্থানে অনেক খাস জমি দখলের চেষ্টায় স্থানীয় প্রভাবশালী ও ভূমিদস্যুরা। জেলা প্রশাসকের কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, এ জেলায় মোট খাসজমির পরিমাণ ১২ হাজার ৭৭৫ একর। এর মধ্যে কৃষি জমি ৫ হাজার ৬১৭ ও অকৃষি জমি ৭ হাজার ১৫৮ একর। তার মধ্যে শুধু পীরগঞ্জ উপজেলায় মোট খাসজমির পরিমাণ ২ হাজার ৮৮৫ একর, যার মধ্যে কৃষি খাসজমির পরিমাণ ১ হাজার ২১৭ এবং অকৃষি খাসজমির পরিমাণ ১ হাজার ৬৬৮ একর। স্থানীয় লোকজন জানান, জেলার পীরগঞ্জ উপজেলার বৈরচুনা ইউনিয়নের খেকিডাঙ্গী গ্রামটি আগে জমিদারদের সম্পত্তি ছিল। এটি জমিদার অজয় সিং, ভজয় সিং ও পিত্তি সিংয়ের সম্পত্তি। ১৯৪৭ সালে ভারত-পাকিস্তান ভাগের পর জমিদার অজয় সিং, ভজয় সিং ও পিত্তি সিং ভারতে চলে যান। ফলে এ জায়গাটি মালিকানাহীন হয়ে পড়ে ছিল দীর্ঘদিন। তখন থেকে লোকসমাগম না থাকায় এলাকাটি ঘন জঙ্গলে পরিপূর্ণ ছিল। সেখানে বাঘ-ভল্লুক আর খেঁকশিয়াল দেখা যেত। তাই পরে জায়গাটির নাম হয়েছে খেকিডাঙ্গী।
স্বাধীনতা যুদ্ধের পর খেকিডাঙ্গীতে প্রথমে ভূমিহীন আবদুস সালাম নামে এক কৃষক এসে জঙ্গল কেটে বসবাস শুরু করেন। পরে একে একে সেখানে ভূমিহীন নূর ইসলাম, আইজুল মিয়া, সাদেক আলী, মাইনদ্দিন প্রমুখ আসেন বসবাসের জন্য। এর পর থেকে খেকিডাঙ্গী ধীরে ধীরে বসবাসের উপযোগী হলে প্রায় ৭০টি ভূমিহীন পরিবার সেখানে বসবাস শুরু করে। এর পর থেকেই তারা ভোগদখল করে এ সম্পত্তি। এদিকে জমির মালিকানা না থাকায় স্বাধীনতা যুদ্ধের আগেই সে জায়গাটি রেকর্ডে খাস বলে ঘোষণা দেয় পাকিস্তান সরকার।
ভূমিহীন পরিবারগুলোর অভিযোগ, দু-তিন বছর ধরে মিনার আলম, আবদুল আজিজসহ তাদের আত্মীয়স্বজনরা পীরগঞ্জ উপজেলার বৈরচুনা ইউনিয়নের খেকিডাঙ্গী গ্রামের ৮০ দশমিক ৭ একর জমি নিজেদের পৈতৃক সম্পত্তি বলে দাবি করে। কিন্তু তারা কোনো বৈধ কাগজপত্র দেখাতে পারেনি। এ খাসজমির দখল নিয়ে বিরোধ দেখা দিলে মিনার আলম ও তাদের আত্মীয়স্বজনরা ভুয়া দলিলের মাধ্যমে খেকিডাঙ্গী গ্রামের জগন্নাথপুর মৌজার ১৩৬২ নম্বর দাগের এ জমি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বে-অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের কাছে বিক্রি করে দেয় বলেও অভিযোগ ভূমিহীনদের। জমি কেনার পর থেকেই বে-অ্যাগ্রো গ্রুপ খেকিডাঙ্গী গ্রামের জগন্নাথপুর মৌজার জায়গাটি দখলের জন্য উঠেপড়ে লেগেছে বলে অভিযোগ ভূমিহীনদের। গত দু-তিন বছরে কয়েক দফায় জমি দখলের চেষ্টা, ভূমিহীনদের ওপর হামলা ও বাড়িঘর ভাংচুরের ঘটনা ঘটেছে বলেও জানান তারা। তাছাড়া ভূমিহীনদের জমি দখল করতে না পেরে তাদের একাধিক মামলা দিয়েও হয়রানি করা হচ্ছে। খেকিডাঙ্গী গ্রামের ভূমিহীন রমজান আলী ও আবদুল খালেক জানান, সরকারের আইন অনুযায়ী ২০ বছরের বেশি কোনো খাসজমিতে বসবাস করলে সে জমির মালিকানা পাওয়া যায়। আমরা ৩৫-৪০ বছর ধরে এসব খাসজমিতে বসবাস করছি। কিন্তু এখনও মালিকানা পাচ্ছি না। এ গ্রামের ভূমিহীন সাদেক আলী, আফরোজ ও হুসেন মিয়া বলেন, বে-অ্যাগ্রো নামের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান দু-তিন বছর ধরে এখানকার খাস জমি দখলের চেষ্টা করছে। তারা ভূমিহীনদের উচ্ছেদ করে এখানে তাদের প্রতিষ্ঠানের ফার্ম করতে চায়। সেজন্য তারা কয়েকবার হামলা ও ভাংচুর চালায় তাদের বাড়িঘরে।
এ ব্যাপারে বে-অ্যাগ্রো গ্রুপের প্রশাসনিক কর্মকর্তা পার্থপ্রতীম অবৈধভাবে বা জোর করে খাসজমি দখলের অভিযোগ অস্বীকার করে জানান, আমরা বে-অ্যাগ্রো লিমিটেড সিলেটের পক্ষে পীরগঞ্জ উপজেলার খেকিডাঙ্গী গ্রামের জগন্নাথপুর মৌজার ১৩৬২ নম্বর দাগের ৮০.৭০ একর জমির মধ্যে ওই জমির রেকর্ডীয় মালিকের কাছ থেকে ৭৪ একর জমি কিনেছি। আইনগতভাবে ওই জমি এখন কোম্পানির। কিন্তু কিছু ভূমিহীন পরিবার ওই জমি দখল করে রেখেছে। এ ব্যাপারে আমরা কয়েকটি মামলাও করেছি। আমরা আইনি প্রক্রিয়ায় এ দখলকৃত জমি উদ্ধার করব বলেও জানান তিনি। এ ব্যাপারে পীরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবিএম ইফতেখারুল ইসলাম খন্দকার জানান, বিষয়টি সম্পর্কে শুনেছি। কিন্তু এ ব্যাপারে আমি সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ পাইনি। বিষয়টি সম্পর্কে খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা।