সোমবার, 24 নভেম্বর 2014 11:12

কৃষিজমিতে ভূমিখেকোদের আগ্রাসন ॥ নোয়াখালীর ৪ হাজার একর খাসজমি বেদখল

সর্বনাশা মেঘনার ভাঙ্গনে সর্বস্বহারা চরের মানুষ আশ্রয় হারাচ্ছে

দৈনিক জনকন্ঠ || সর্বনাশা মেঘনার করালগ্রাস ভাসিয়ে নিয়ে যায় ভিটে-মাটি, সহায়-সম্বল সবকিছু। তারপর আশ্রয় জোটে কেরিংচরের খাস জমিতে। নির্জন চর এলাকায় তখন জাহাঙ্গীর ডাকাতের রাজত্ব। চারদিকে আতঙ্ক। তাঁর ইশারায় চলত সবকিছু। তিনিই ছিলেন এলাকার অঘোষিত সম্রাট। তাঁকে এক হাজার টাকা দিয়ে জমি কিনে পরিবার নিয়ে বসবাস শুরু করেন ভূমিহীন রহিমা বেগম। চরের জমিতে চাষাবাদ করে চলে জীবন-জীবিকা। এখানে বসবাস করতে গিয়ে বার বার জমি কেড়ে নেয়ার আঘাত আসে। ফসল কেটে নেয়া, ডাকাতিসহ জমি দখল করে নিতে তৎপর হয়ে ওঠে দস্যুবাহিনীর। জমি থেকে উচ্ছেদের নোটিস আসে বার বার। উদ্দেশ্য অর্থ দেয়া। কিন্তু কোথা থেকে অর্থ দেবে চরে বাস করা অসহায় মানুষগুলো। মানবিক এ ভাবনা কখনই ডাকাতদের মনে আসেনি। পাষ- ওরা।
চরবাসী জানান, এক সময় জমি রক্ষায় সংঘবদ্ধ হয় চরের মানুষ। প্রতিবাদ করে। ডাকাত দলের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করেন তারা। তাতে লাভ হয়নি। রাত-দিনের যে কোন সময় চরের বসতিতে হামলে পড়ে সশস্ত্র ডাকাল দল। বাবা-মায়ের সামনে মেয়েকে, স্বামীর সামনে স্ত্রীকে, শ্বশুরের সামনে পুত্রবধূকে, ভাইয়ের সামনে বোনকে ধর্ষণ করে তারা। নির্বিচারে চলে মানুষের ওপর অত্যাচার। নির্যাতন। অসহায় মানুষের গগনবিদারী চিৎকারেও নরপিশাচদের মন গলেনি। প্রকাশ্যে মেয়েদের উলঙ্গ করে নির্যাতন করার ঘটনাও সেখানে কম নয়। এসব ঘটনার শিকার হয়ে চরের অনেক নারী আত্মহত্যা করেছেন। নিখোঁজ আছেন কেউ কেউ। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ডাকাত সর্দারদের পরিবর্তন হয়। কেউ অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গুলিতে মারা যান। জাহাঙ্গীর ডাকাতের পর আসে বাশার ডাকাত। তার পতনের পর নতুন করে সাম্রাজ্য দখল করেন নাসির ডাকাত ওরফে নাসির কেরানি। র‌্যাবের গুলিতে সে মারা যাওয়ার পর গিয়াসউদ্দিন ডাকাতের অত্যাচার শুরু হয়। এভাবে পর্যায়ক্রমে চরে দস্যুবাহিনীর উত্থান আছেই। তাঁরা জানিয়েছেন, জমি রক্ষা করতে গিয়ে চরের মানুষকে এ রকম প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে হচ্ছে বছরের পর বছর। একপর্যায়ে সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে জমি এ্যাকুয়ার করার প্রস্তাব আসে। গ্রামবাসীকে বুঝিয়ে শুনিয়ে প্রথমে কিছু জমি নেয় তারা। এরপর পর্যায়ক্রমে জমি দখলের প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। ২০১২ সাল থেকে চরে নতুন করে বাড়ি নির্মাণ করতে দেয়া হচ্ছে না। কৃষিজমি কেড়ে নেয়া হচ্ছে। একপর্যায়ে গ্রামবাসী সংঘবদ্ধ হয়ে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে যেতে চাইলে রাস্তায় রাজনৈতিক কর্মীদের দিয়ে হামলা চালানো হয়।
নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলার কেরিংচরের হাজীপুর গ্রামের বাসিন্দা রহিমা বেগম আরও জানান, ভূমিহীন চরবাসীর দাবির মুখে একদিকে সরকারের পক্ষ থেকে খাস জমি বন্দোবস্ত দেয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। অন্যদিকে একটি বিশেষ বাহিনীর পক্ষ থেকে গরিবের জমি কেড়ে নেয়া হচ্ছে। প্রভাবশালীদের ছত্র-ছায়ায় ও প্রশাসনের সহযোগিতায় চিংড়িঘেরের নামে বিঘার পর বিঘা কৃষিজমি বেহাত হচ্ছে ওই এলাকায়। তিনি জানান, চরবাসীর দাবি কৃষিজমি ভূমিহীনদের নামে বরাদ্দ দেয়া হোক। বন্ধ করা হোক জমি দখলের সকল অশুভ তৎপরতা। আটটি বেসরকারী উন্নয়ন সংগঠন ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠানের গবেষণায় বলা হয়েছে, নোয়াখালী জেলার হাতিয়া ও চট্টগ্রামের সন্দীপ উপজেলার চরাঞ্চলে প্রায় ৪৫ হাজার একর কৃষিজমি সেনাবাহিনীকে বরাদ্দ দেয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এর মধ্যে চরকেরিং মৌজার কৃষিজমি রয়েছে ১০ হাজার একর। হাতিয়া উপজেলা অংশের ১৮ হাজার ৪২০ দশমিক ৫৬ একর কৃষিজমি রয়েছে। এতে কৃষিনির্ভর পাঁচ হাজারের বেশি পরিবারকে উচ্ছেদ করা হবে। এর পার্শ্ববর্তী জাইজ্জার চর এলাকায় ৩৫ হাজার একর কৃষিজমির পুরোটাই সেনাবাহিনীকে দেয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
নোয়াখালীর সুবর্ণচর এলাকার চিত্রও ঠিক এ রকম। মেঘনা নদীর মোহনায় অবস্থিত চরকেরিং মৌজার প্রায় পাঁচ হাজার ভূমিহীন পরিবারকে চাষাবাদের কৃষিজমি ও বসতভিটা থেকে উচ্ছেদ করে সেনা প্রশিক্ষণ এলাকা স্থাপন না করার আহ্বান জানানো হয়। পরামর্শ হিসেবে বলা হয়Ñ স্থাপনা নির্মাণের জন্য জনবসতিশূন্য বা কৃষিকাজের অনুপযোগী এলাকা কিংবা জলদস্যুদের দখলে থাকা বিপুল পরিমাণ খাস জমি ব্যবহার করা যেতে পারে। গবেষণার পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে- শুধু পাঁচটি এলাকাই নয়, জমি দখলের এই প্রক্রিয়াটি সারাদেশেরই এক সাধারণ নিয়মিত ঘটনা। আবাসন, ইটের ভাঁটি, অপরিকল্পিত শিল্পায়ন, নগরায়নের নামে কৃষিজমি হারিয়ে যাচ্ছে। গবেষণা প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, কেরিংচর এলাকার ভূমিহীনদের পর্যায়ক্রমে আশ্রয়ণ প্রকল্পের আওতায় আনতে ইতোমধ্যে উদ্যোগ নিয়েছে জেলা প্রশাসন। কিন্তু তাদের চাষাবাদের জমি বরাদ্দ দেয়ার বিষয়ে এখনও জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সিদ্ধান্ত আসেনি। ফলে কৃষিনির্ভর পরিবারগুলোর জীবন ও জীবিকা বিপন্ন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
কেরিংচরের বাসিন্দা মোঃ সমীর জানান, নোয়াখালী-৬ আসনের সংসদ সদস্য আয়শা ফেরদৌস ভূমিহীন মানুষের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। শোনা যাচ্ছে, আগামী কয়েকদিনের মধ্যে তিনি এলাকায় আসবেন। একটি বিশেষ বাহিনীর নামে জমি বরাদ্দ দেয়ার ব্যাপারে এলাকাবাসীর সঙ্গে আলোচনায় বসবেন তিনি। এমন কথা আছে, আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে সেনাবাহিনীর প্রকল্পের কাজের উদ্বোধন করতে পারেন সাংসদ সদস্য। তিনি বলেন, আমারা আশা করি জনপ্রতিনিধি হিসেবে তিনি সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়াবেন। অন্যথায় চরবাসী সংঘবদ্ধ হয়ে বিগত দিনের মতো জমি রক্ষায় উদ্যোগ নেবে। প্রতিবাদ করবে। প্রতিরোধ গড়ে তুলবে। তিনি বলেন, স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা, প্রভাবশালী ব্যক্তিসহ বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের নামে এই এলাকায় জমি দখলের রীতিমতো প্রতিযোগিতা চলছে। দস্যুবাহিনী দিয়ে জমি দখল করানো হয় অথচ খাস জমি বেহাত হয়ে গেলেও কারও কোন মাথাব্যথা নেই।
নোয়াখালীতে চার হাজার একর খাস জমি বেদখল ॥ নোয়াখালীতে সুবর্ণচর, হাতিয়া ও কোম্পানিগঞ্জ উপজেলায় প্রায় চার হাজার একর কৃষি খাস জমি দখল করে রেখেছে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান। উচ্ছেদ করার চেষ্টা করেও রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে ব্যর্থ হচ্ছে প্রশাসন। যাতে এসব জমি থেকে প্রভাবশালীদের উচ্ছেদ না করা যায় সে জন্য সরকারের বিরুদ্ধে কয়েকটি মামলাও করেছেন দখলকারীরা। এসব জবর-দখলের পেছনে প্রশাসনের হাত রয়েছে বলেও অভিযোগ আছে। জেলা প্রশাসকের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, শুধু সুবর্ণচরেই দুই হাজার ৭শ’ ১৬ দশমিক ৯০ একর জমি মৎস্য খামারের নামে দখলে রয়েছে। রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নাম বেদখল করে রেখেছে সরকারী খাস জমি অথচ এক সময়ে এসব জমিতে প্রচুর পরিমাণে ধানসহ কৃষিপণ্য উৎপাদন হতো।
এর মধ্যে খন্দকার রুহুল আমিন ঢাকা-নিউইয়র্ক এগ্রোফিশারিজের নামে প্রায় ১৪৫ একর, মোঃ মোশারেফ হোসেন মোশারেফ মৎস্য খামার নামে ১৪১ একর, বেগমগঞ্জের সাবেক সাংসদ আবুল হাসেমের পারটেক্স মৎস্য খামারের নামে ১২৮ একর, ফেনীর মোঃ শাহজাহানের লক্ষ্মী এগ্রোফিশারিজের নামে ৪৬২ দশমিক নয় একর, নুরু মিয়ার মৎস্য খামারের নামে ১২৯ দশমিক ৮৭ একর, মোঃ আবুল কালাম আজাদেরÑ আজাদ এগ্রো ফিশারিজের নামে ১১২ দশমিক এক একর, গ্লোব এগ্রোভিট/ফিশারিজ নামে ২১৫ দশমিক ১৬ একর, আল-আমিন গ্রুপের আল-আমিন এগ্রো ফিশারিজসহ ৬টি প্রতিষ্ঠানের নামে ১২০ দশমিক ৯০ একর, সলজিত ডেইরি এ্যান্ড মৎস্য খামারের নামে ৯৭ একর, আল-বারাকা এগ্রোফিশারিজ নামে ১২৫ দশমিক ৬৬ একর, বাইতুশ সাইফ মৎস্য খামারের নামে ১৫২ দশমিক ৫৫ একর, মৈত্রী এগ্রোফিশারিজের নামে ২৬৮ দশমিক ৮৭ একর উল্লেখযোগ্য। অপরদিকে, জেলার কোম্পানীগঞ্জের চর এলাহী ইউনিয়নের চর কলমীর ৪৩২ একর জমির বেশিরভাগ মৎস্য প্রজেক্টের নামে অবৈধভাবে দখল করেছে প্রভাবশালীরা। বাদ পড়েনি হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞাকৃত জমিও। এ ছাড়া বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের নামে-বেনামেও সরকারী খাস জমি দখলের অভিযোগ রয়েছে।