শুক্রবার, 21 নভেম্বর 2014 00:00

কৃষিজমিতে ভূমিখেকোদের আগ্রাসন ১ ॥ দানবের থাবা

০ চাষের জমি দ্রুত চলে যাচ্ছে অকৃষি খাতে
০ মামলা-মোকদ্দমায় অস্থির জমির মালিকরা
০ বিধিনিষেধের তোয়াক্কা করে না ভূমিদস্যুরা
০ প্রশাসন নীরব

দৈনিক জনকন্ঠ || ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের জৈনাবাজার থেকে গাজীপুর ইউনিয়নের শ্রীপুর উপজেলার শৈলাট গ্রামে যাওয়ার পথে প্রায় ১০ কিলোমিটার পাকা রাস্তার উভয় পাশের কৃষিজমির স্মৃতিচিহ্ন দিন দিন মুছে যাচ্ছে। এখানকার প্রায় সব কৃষিজমিই দ্রুত অকৃষি খাতে যাচ্ছে। দখলের থাবা থেকে বাদ যাচ্ছে না কবরস্থান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের জমিও। এ সব জমিতে নির্মাণ হচ্ছে শিল্প, বাণিজ্যিকসহ বিভিন্ন ধরনের স্থাপনা। এলাকায় কৃষিজমিকে বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারের বিধিনিষেধেরও তোয়াক্কা করছেন না কেউ। নীরব প্রশাসন। গাজীপুর ইউনিয়নের বেশিরভাগ কৃষিজমির চিত্র এটি! এর মধ্যে মেসার্স টোটাল কেয়ার প্লাটিনাম লিমিটেডসহ একই ব্যক্তির চার প্রতিষ্ঠানের নামে জমি দখল, স্থানীয়দের উচ্ছেদ, হামলা, মামলাসহ অত্যাচার নির্যাতনের অভিযোগের শেষ নেই। এ সব কারণে শৈলাট, গাজীপুর ও নয়াপাড়া এই তিন গ্রামের মানুষ এখন দিশেহারা। গ্রামবাসী জমি দখলের প্রতিবাদে সোচ্চার হলেও প্রশাসন তাদের পাশে নেই। জনস্বার্থে এগিয়ে এসেছে বিভিন্ন মানবাধিকার ও উন্নয়ন সংগঠন। এলাকাবাসীর যত অভিযোগ চার প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার আলী হায়দার রতনের বিরুদ্ধে। তাঁরা বলছেন, তিন গ্রামের ৩৫০ একর কৃষিজমি ইতোমধ্যে দখলে নিয়েছেন তিনি। মিথ্যা দলিলপত্র তৈরি করে ইতোমধ্যে ৫০০ একর জমির নামজারি করে নিয়েছেন। জমি দিতে রাজি না হওয়ায় ৩০০ পরিবারের বিরুদ্ধে একুশটির বেশি মামলা দেয়া হয়েছে। প্রতিবাদ করলে পুলিশ দিয়ে হয়রানি করা হয়। সন্ত্রাসী বাহিনী দিয়ে হামলা করা হচ্ছে প্রতিনিয়ত। স্থানীয়দের ভয় দেখিয়ে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করা হয়েছে গোটা এলাকায়। প্রশাসন, ভূমি অফিসসহ সংশ্লিষ্টদের হাত করেই ২০০৮ সাল থেকে তিনি এ সব অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছেন। সবার কাছে তিনি ‘দস্যু রতন’ হিসেবে পরিচিত।
এ সব বিষয়ে জানতে চাইলে মেসার্স টোটাল কেয়ার প্লাটিনাম লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোঃ আলী হায়দার রতন জনকণ্ঠের কাছে তাঁর বিরুদ্ধে আনা সকল অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, এ সব অপপ্রচার। তিনি বলেন, গাজীপুর ইউনিয়নের শৈলাট, গাজীপুরসহ নয়াপাড়া গ্রামে আমার কোন শিল্পপ্রতিষ্ঠান নেই। দুই-একটি জমি কিনেছি মাত্র। কোন জাল দলিল করিনি। কারও জমি বলপূর্বক হাতিয়ে নেয়ার ঘটনাও নেই। তিনি বলেন, এলাকায় কেউ জায়গা জমি কিনতে গেলেই তাঁর বিরুদ্ধে বিভিন্ন মহল থেকে জমি দখলসহ নানা অপপ্রচার চালানো হয়। বিশেষ করে একশ্রেণীর জমির দালাল চক্র এ সব অপপ্রচারে লিপ্ত। তিনি বলেন, জমি কেনার পর দখল নেয়ার সময় স্থানীয় লোকজন বাধা দেয়। তখন তাদের বাড়তি অর্থ দিতে হয়। অর্থাৎ একই জমি বারবার কিনতে হয়। তাঁর বিরুদ্ধে আনা সকল অভিযোগ যাচাই-বাছাইয়ের পরামর্শ দেন তিনি। স্থানীয় লোকদের হুমকিসহ পুলিশ ও সন্ত্রাসী বাহিনী দিয়ে হয়রানির অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, আমি কাউকে হুমকি দেইনি। নানা অভিযোগ নিয়ে কেউ কেউ প্রশাসনের আশ্রয় নেয়ার পর তদন্ত শেষে সকল অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হয়। তখন একশ্রেণীর সুবিধাবাদী লোক প্রশাসনকে বিশ্বাস করে না। উচ্চপর্যায়ে অভিযোগ করেন। এর আগেও বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের সহযোগিতায় আমার বিরুদ্ধে মানববন্ধন, সংবাদ সম্মেলন করা হয়েছে।
গাজীপুর ইউনিয়নে মোট জমির পরিমাণ ১১ হাজার ৪২০ একর। শৈলাট গ্রাসের বাসিন্দা নূরুল ইসলাম সরকার জানান, একটি বেসরকারী শিল্পপ্রতিষ্ঠান, সরকারদলীয় লোকজনসহ জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় তিন গ্রামে শিল্পায়নের নামে একের পর এক কৃষিজমি বেদখল হচ্ছে। তিনি জানান, জমি না দেয়ায় বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কেনা জমিতে মাটি ফেলায় আশপাশের কৃষিজমি নষ্ট হচ্ছে। প্রতিবাদ করলে মামলা ও পুলিশ দিয়ে হয়রানি করা হয়। সন্ত্রাসী বাহিনী দিয়ে হামলা করা হচ্ছে প্রতিনিয়ত। তিন গ্রামের বাসিন্দাদের ভয় দেখিয়ে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করা হয়েছে। টোটাল কেয়ার ও প্লাটিনাম নামের দুটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই দুটি প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে সাধারণ মানুষ সবচেয়ে বেশি অত্যাচার অবিচারের শিকার হচ্ছেন। তাদের কারণে কৃষিজমি নিয়ে এলাকায় থাকা এখন দায়। গ্রামবাসীর কৃষিজমি রক্ষায় এগিয়ে আসেন স্থানীয় বাসিন্দা এ্যাডভোকেট লুৎফর রহমান। এ জন্য তাকেও জীবননাশের হুমকি দেয়া হচ্ছে। জীবনের নিরাপত্তা দাবি করে পুলিশের মহাপরিদর্শক বরাবর আটটি মানবাধিকর ও উন্নয়ন সংগঠনের পক্ষ থেকে চিঠি দেয়া হয়েছে সম্প্রতি। লুৎফর অভিযোগ করে বলেন, আলী হায়দার রতন নামের এক শিল্পমালিক ৩৫০ একর কৃষিজমি দখলের চেষ্টা করছেন। সাধারণ মানুষের ভূমি রক্ষায় মানবাধিকার কমিশনে অভিযোগ দাখিল করার পর আমাকে হত্যার হুমকি দেয়া হচ্ছে। স্থানীয় প্রশাসনের কৃষিজমি দখলে সহযোগিতা করারও অভিযোগ করেন তিনি। অব্যাহত হত্যার হুমকির মুখে চলতি বছরের ১৯ জুলাই জয়দেবপুর থানায় জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে জিডি করেন তিনি (নম্বর-১৩৭২)।
বিভিন্ন বেসরকারী ও মানবাধিক সংগঠনের এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শ্রীপুর উপজেলার গাজীপুর ইউনিয়নের তিনটি গ্রামে একই ব্যক্তি ও তাঁর সহযোগীরা নিরীহ কৃষিজীবী ও গ্রামবাসীর জমি হাতিয়ে নিচ্ছে। মিথ্যা দলিলপত্র তৈরি করে ইতোমধ্যে ৫০০ একর জমির নামজারি করে নিয়েছে। দখল করে নিয়েছে ৩০ বিঘার বেশি জমি। শিল্পপার্ক স্থাপনের নামে আরও এক হাজার ২০০ একর জমি হাতিয়ে নেয়ার চেষ্টা চলছে। বেদখলে বাধা দেয়ায় ভাড়াটে গু-া দিয়ে আক্রমণ, মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি এমনকি প্রাণনাশেরও হুমকি দেয়া হচ্ছে। এ জমিগুলোর বেশিরভাগই কৃষি খাতের। রয়েছে বসতভিটা, কবরস্থান, মসজিদ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জমিও। বেসরকারী গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয় শৈলাট এলাকার নিরীহ গ্রামবাসীর প্রায় ৮০০ বিঘা জমি এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের একটি নিজস্ব ক্যাম্পাসের জমি ও পুকুর ভরাট করে নিচ্ছে আলী হায়দার রতন। আলাউদ্দিন আলী ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে একজন। স্থানীয় গ্রামবাসী প্রতিবাদ করায় তাদের হত্যার হুমকি দিচ্ছে দস্যু বাহিনী। সব মিলিয়ে এই এলাকার প্রায় এক হাজার ২০০ একর জমি একই ব্যক্তির মালিকানাধীন চারটি কোম্পানি অবৈধ প্রক্রিয়ায় দখলের পাঁয়তারা করছে। গাজীপুর ইউনিয়নের তিন গ্রামের স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, জবান আলী মাস্টারের জমি ভুয়া খতিয়ান তৈরি করে দখলে নেয় শিল্পপতি রতন। খতিয়ান সূত্রে ১১ বিঘা জমির মালিক ডা. আবু সাঈদ। ২০০৯ সালে রতন ভুয়া রেজিস্ট্রেশন করে জমিটি হাতিয়ে নেয়ার চেষ্টা করে। তখন সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুনের হস্তক্ষেপে জমিটি ফিরিয়ে দেয়া হয়। পরবর্তীতে ২০১৩ সালে আবারও ভুয়া ওয়ারিশ তৈরি করে জমিটি হাতিয়ে নেয়া হয়।
বেহাত হলো যাদের জমি ॥ বেসরকারী ও মানবাধিকার বিভিন্ন সংগঠনের জরিপে দেখা গেছেÑ গাজীপুর গ্রামের পুলিশের সাবেক ডেপুটি ইন্সপেক্টর জেনারেল মোঃ তোফাজ্জল হোসেনের চার বিঘা কৃষিজমি, একই ইউনিয়নের বানেছা বেগমের বসতবাড়ি ও কৃষিজমি মিলিয়ে প্রায় তিন বিঘা, মোবারক হোসেনের এক বিঘা কৃষিজমি, মাওলানা মোহাম্মদ আবদুল মজিদের দুই বিঘা কৃষিজমি, মতি মিয়ার আট বিঘা কৃষিজমি, শৈলাট গ্রামের মোঃ শাহজাহানের তিন বিঘা কৃষিজমি, একই গ্রামের আব্দুর শুকুর মাস্টারের ১১ বিঘা কৃষিজমি, জবান আলী মাস্টারের ৪ বিঘা কৃষিজমি, মোসাম্মত মিতু গংয়ের চার বিঘা কৃষিজমি, মোঃ মিজানুর রহমান মিজার এক বিঘা কৃষিজমি, মোঃ মজিবুর রহমান গংয়ের বসতবাড়ি ও সাইল জমি মিলিয়ে ১৬ বিঘা, মোসাম্মাত ফরিদা খাতুনের আট গ-া কৃষিজমি, মোঃ মোফাজ্জল হোসেন গংদের চালাসহ ২ বিঘা জমি, মোঃ জমির উদ্দিনের ১৭ শতাংশের বেশি চালা, জালাল উদ্দিন গংদের বসতবাড়ি ও কৃষিজমি মিলিয়ে চার বিঘা, মোঃ মুক্তার আলীর এক বিঘা কৃষিজমি, ছাবদুল আলী গংদের বসতবাড়ি ও কৃষিজমি মিলিয়ে দুই বিঘা, হেলাল গংদের বসতবাড়ি ও কৃষিজমি মিলিয়ে তিন বিঘা, আফসার উদ্দিন গংদের বসতবাড়ি, পুকুর, কৃষিজমি মিলিয়ে ১৬ বিঘা, হারুন মিয়াদের ১৫ বিঘা কৃষিজমি, ফজলুল হক গংদের দুই বিঘা কৃষিজমি, আবুল কাশেম গংদের ১০ বিঘারও বেশি কৃষিজমি, নূরুল ইসলাম গংদের বসতবাড়ি ও কৃষিজমি মিলিয়ে আট বিঘা, বেলাল উদ্দিনের বসতবাড়ি, পুকুরসহ কৃষিজমি মিলিয়ে তিন বিঘা, হেলাল উদ্দিনের বসতবাড়ি, পুকুরসহ কৃষিজমি মিলিয়ে প্রায় তিন বিঘা ও জুলহাস গংদের কৃষিজমি দুই বিঘা নানা কায়দায় হাতিয়ে নিয়েছে ভূমিদস্যু চক্র।
এছাড়াও শৈলাট গ্রামের আবদুল বারেকের এক বিঘা কৃষিজমিসহ একই গ্রামের আবুল কালাম গংদের দুই বিঘা কৃষিজমি, ডাঃ মোঃ আবদুল আজিজের বসতবাড়ি ও কৃষিজমি মিলিয়ে দেড় বিঘা, একই গ্রামের আবদুল আজিজের দেড় বিঘা জমি, আবদুল মজিদের পুকুর, বসতভিটা ও কৃষিজমি মিলিয়ে তিন বিঘারও বেশি, মোঃ ইব্রাহিম গংদের চার বিঘা, আশরাফ খানের এক বিঘা, জয়নাল আবেদীনের ১৭ শতাংশেরও বেশি, শওকত আলীর দুই বিঘা, হাইজলের দুই বিঘা, হাসমত আলী খাঁর ৫ বিঘা, আম্বিয়া খাতুনের আট শতাংশের বেশি, তাজুল ইসলাম গংদের তিন বিঘারও বেশি, মিল্টন গংদের দুই বিঘাসহ এলাকার অসংখ্য মানুষের কৃষিজমি থেকে শুরু করে বসতবাড়ি, পুকুর, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানসহ কবরস্থানের জমি দখলে চলে গেছে।
দখলের কবলে কবর ও মসজিদের জমিও ॥ শৈলাট গ্রামের সালাম পুলিশ গং অভিযোগ করেন, তাঁর পুকুর, বাড়ি, সাইল জমি, মসজিদ, ঈদগাহ মাঠ, কবরস্থান মিলিয়ে ৩৭ বিঘা জমি দখলে দেয়ার চেষ্টা চলছে। বারবার চেষ্টা করেও কবরসহ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের জমি রক্ষা সম্ভব হয়নি। একই গ্রামের আম্বিয়া খাতুন বলেন, গোরস্তানের পাশে আমার ৯ গ-া জমি দখল করে নিয়েছে আলী হায়দার রতন। জমিতে গেলে তার লোকজন লাঠিসোটা আর ধারালো অস্ত্র দিয়ে ধাওয়া করে। আমাকে বলে, এই জমির যে দলিল তোমার কাছে আছে সেটা সঠিক নয়।
রতনের বিরুদ্ধে প্রায় শত মামলা ॥ ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে এলাকাবাসীর জমি হাতিয়ে নেয়ায় টোটাল কেয়ারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রতনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় ৭০টির বেশি মামলা রয়েছে। এছাড়াও দেওয়ানী আদালতে আছে দশটির বেশি মামলা। এদিকে এলাকাবাসীদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ তুলে প্রায় ৩০ ক্রিমিনাল মামলা দায়ের করেছেন রতন।
দুই প্রতিষ্ঠানের নামেই ৩০০ একর জমি ॥ স্থানীয় ভূমি অফিসের লোকদের হাত করে স্থানীয় বাসিন্দাদের জমির মালিকানা বদল করা হয়েছে। অথচ যারা জমির প্রকৃত মালিক তাঁরা খবরই রাখেন না। বিশেষ কোন প্রয়োজনে জমির খোঁজ নিতে গিয়েই সন্ধান মিলছে নিজের জমি বেহাত হওয়ার। ভুয়া মিউটেশনের মাধ্যমে মালিকানা বদলে বসেছে অন্য কারও নামে। মাওনা ইউনিয়ন ভূমি অফিসে এখন আলোচিত জমির মালিক আলী হায়দার রতন। মেসার্স টোটাল কেয়ার ও প্লাটিনাম লিমিটেডের পক্ষে ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলী হায়দার রতনের নামে জমি খারিজ করা হয়েছে। উল্লিখিত প্রতিষ্ঠানের নামে সাড়ে ৩০০ একর জমি রতন খারিজ করেছেন বলে জানা গেছে। এছাড়াও তাঁর মালিকানাধীন আরও দুটি প্রতিষ্ঠান তো রয়েই গেছে। ২০১০ সাল থেকে চলতি বছর বিশাল এই পরিমাণ জমির মালিকানা পরিবর্তনের দাবি তাঁর বিরুদ্ধে। অথচ গাজীপুর জেলায় আইনের নির্ধারিত সিলিং অনুযায়ী একই ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নামে ৬০ বিঘার বেশি জমি কেনা যাবে না। অথচ প্রশাসনের নাকের ডগায় অপকর্ম করে বেড়ালেও রতনের বিরুদ্ধে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোন ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না।
নামজারি ও জমাভাগের নথি নং-৩০৫৮/১০-১১ তারিখ ২৯ মে ২০১১ অনুযায়ী শৈলাট মৌজার দুই একর পৌনে চার শতক সাইল জমির মালিকানা পরিবর্তন করা হয়। এছাড়াও নামজারি ও জমাভাগ নথি নং-৩০০৩/১০-১১ ২০১২ সালের ২৪ মের নথিতে দেখা গেছে, শ্রীপুর মৌজার ৫৮ শতক জমি খারিজ করা হয়েছে। ২০১২ সালের ৪ জানুয়ারি নথি নং-১৮০৪/১০-১১ অনুযায়ী শ্রীপুর মৌজার ২০০ একরের বেশি জমি খারিজ করার রেকর্ড পাওয়া গেছে। ভূমি অফিস থেকে সংগৃহীত প্রায় ৭০ নথিতে বিশাল জমির মালিক হিসেবে রতনের নাম উল্লেখ রয়েছে। ভূমি হাতছাড়া মালিকরা বলছেন, ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে বেশিরভাগ জমির মালিকানা পরিবর্তন করা হয়েছে।
শৈলাট গ্রামের বাসিন্দা আবদুস সালামের দায়ের করা জমি জালিয়াতির মামলায় বলা হয়, শৈলাট মৌজার খতিয়ান ১৩০, আরএস খতিয়ান ২২৯ এর দুই বিঘা জমি তিনি বিক্রি করেননি। স্থানীয় ভূমি অফিস থেকে আলী হায়দার রতন এই জমি খারিজ করে নিজের নামে করে নেয়। এর প্রেক্ষিত্রে আবদুস সালাম শ্রীপুরের সহকারী কমিশনার (ভূমি) বরাবর ভুয়া জমি নামজারির অভিযোগে রতনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন। এদিকে ২০০৯ সালে স্থানীয় বাসিন্দা মহব্বত আলী মাস্টার টোটাল কেয়ারের কাছে সাত বিঘা জমি বিক্রি করেন। এরপর ২০১০ সালে একই প্লটের দুই বিঘা জমি জোর করে দখল করে নেন প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক রতন। জমি দখলের প্রতিবাদ করায় মহব্বত আলীর ছেলে মোঃ লুৎফর রহমানের বিরুদ্ধে ২০১১ সালের সাত এপ্রিল শ্রীপুর থানায় চাঁদাবাজির মামলা দায়ের করেন তিনি। একই বছরের ১৮ মে গাজীপুর জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির বৈঠকে এ মামলার বিষয়টি তুলে ধরা হয়। জমি দখলের প্রতিবাদ করায় মহব্বত আলী মাস্টারের ছেলের বিরুদ্ধে চুরির মামলা দায়ের করায় বৈঠকে পুলিশ সুপারের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলেও কাজের কাজ কিছুই হয়নি।
২০১০ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর গাজীপুরে জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন। এতে শ্রীপুর পৌর মেয়র আনিসুর রহমান বলেন, এখানকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভাল হলেও ভূমি দস্যুদের কারণে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিঘিœত হচ্ছে। যারা এ ধরনের ঘটনার সঙ্গে যুক্ত তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানিয়েছিলেন তিনি। একই বৈঠকে র‌্যাব-১ এর উপ-পরিচালক মেজর নিশাত ভূমি দখলের বিষয়টি তুলে ধরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। তিনি শ্রীপুর উপজেলার গাজীপুর ইউনিয়নের শৈলাটসহ তিন গ্রামের বাসিন্দাদের বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক মামলাগুলো নিষ্পত্তির দাবি জানান।
২০১০ সালের ১৮ এপ্রিল অনুষ্ঠিত গাজীপুর জেলা শান্তিশৃঙ্খলা কমিটির বৈঠকে জেলা প্রেসক্লাব সভাপতি মাযহারুল ইসলাম বলেন, গাজীপুর ইউনিয়নের শৈলাটে আলী হায়দার রতন ও তাঁর বাহিনী মেসার্স টোটাল কেয়ার প্লাটিনামের নামে শিল্পপার্ক স্থাপনের জন্য সাধারণ মানুষের জমি দখল, ভুয়া দলিল বানিয়ে জমি হাতিয়ে নিচ্ছে। এতে শ্রীপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জড়িত আছেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি। অভিযোগের প্রেক্ষিতে বাস্তবায়নকারী কমিটি জেলা তথ্য অফিসার ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে বিষয়টি তদন্ত শেষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দিলেও কাজের কাজ কিছুই হয়নি। দিন দিন অত্যাচারের মাত্রা বেড়েছে।
এছাড়া শৈলাটের বাসিন্দা হেলাল ও বেলালের কাছ থেকে ৯ শতাংশ জমি কেনেন রতন। অথচ ১৩৮৭২/৭৩ নম্বর দলিলে নয় শতকের পরিবর্তে বেলালের কাছ থেকে ১৩৭ ও হেলালের কাছ থেকে ১২০ শতক জমি লিখে নেয়। পরবর্তীতে শ্রীপুর থানায় বেলাল ২০০৯ সালের ২১ নবেম্বর রতনসহ চারজনকে আসামি করে জিডি করেন। একই বছরের ২৭ নবেম্বর একই থানায় হেলাল একই আসামিদের বিরুদ্ধে জিডি করেন। তাঁদের অভিযোগ ছিল ভুয়া জাল দলিল তৈরি করে ও হত্যার হুমকি দিয়ে জমি হাতিয়ে নেয়া। এতে হাল ছাড়েননি চতুর রতন। ২০১৩ সালের ২২ আগস্ট ১১৩৮৯/৯০ নং দলিলে বেলাল-হেলাল দুই ভাই, চার ছেলে, দুই স্ত্রীসহ পরিবারের সদস্যদের হত্যার হুমকি দিয়ে পুরো জমিই ৬৬ লাখ টাকায় দলিল করিয়ে নেয়। এর মধ্যে এখনও বকেয়া ৪০ লাখ টাকা। অথচ লাঠিয়াল বাহিনী দিয়ে উচ্ছেদ করা হয়েছে বেলাল ও হেলালের পরিবারকে।