বৃহস্পতিবার, 22 সেপ্টেম্বর 2016 15:17

কৃষি ব্যাংকের গলার কাঁটা 'অকৃষি ঋণ'

সমকাল || কৃষি খাতে অর্থায়নের মাধ্যমে গ্রামীণ অর্থনীতি শক্তিশালী করতে ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক প্রতিষ্ঠিত করে সরকার। শুরু থেকে ব্যাংকটি প্রধানত শস্য ও মৎস্য চাষ, গাভী পালন ও এসএমই খাতে ঋণ বিতরণ করে আসছিল। ২০০৮ সালে ব্যাংকটিকে লাভজনক করার জন্য তৎকালীন পরিচালনা পর্ষদ বৈদেশিক বাণিজ্য ও অকৃষি খাতে ঋণ বিতরণের সিদ্ধান্ত নেয়। যা এখন ব্যাংকটির গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। 

সম্প্রতি ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম এ ইউসূফ এক চিঠিতে অর্থমন্ত্রীকে এমন তথ্যই জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, অকৃষি খাতে বিতরণ করা ঋণের অধিকাংশই এখন খেলাপি। ২০০৮-০৯ অর্থবছর থেকে বৈদেশিক বাণিজ্য খাতে গুরুত্ব আরোপ করে অনিয়মিত বাণিজ্যিক ঋণ প্রদান করে ব্যাংকের বিপুল পরিমাণ অর্থ ঝুঁকির মুখে ফেলা হয়। সে সময় ব্যাংকটিকে লাভজনক করার মিথ্যা প্রচারণায় এ ধরনের অপ্রয়াস চালানো হয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়। কারণ, পল্লী অর্থনীতির শস্য, মৎস্য, প্রাণিসম্পদ ও এসএমই খাতে নিয়োজিত ব্যাংকটি নির্ধারিত ক্ষেত্রে বিপুল সম্ভাবনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। 

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, পরিচালনা পর্ষদের এই সিদ্ধান্তের পর ২০১৩ সাল পর্যন্ত ব্যাংকটি ১৬টি বৈদেশিক বাণিজ্য শাখার মাধ্যমে অকৃষি বাণিজ্যিক খাতে ১ হাজার ৯২৬ কোটি টাকা ঋণ বিতরণ করে। কিছুদিনের মধ্যেই এসব ঋণ খেলাপি হতে থাকে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ২০১৫ সালের মে মাসে এক চিঠিতে অর্থমন্ত্রী বৈদেশিক বাণিজ্য ও অকৃষি খাতে ঋণ বিতরণ না করার নির্দেশ দেন। অন্যান্য খাতেও ঋণ বিতরণ সীমিত করার নির্দেশ দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক।

এসব অনিয়মিত ঋণ নিয়মিত করার জোর প্রচেষ্টা চলছে বলে দাবি জানিয়েছেন এমএ ইউসূফ। যদিও সর্বশেষ ত্রৈমাসিকে অকৃষি বাণিজ্যিক ঋণের ৫০০ কোটি টাকা নতুন করে খেলাপি হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত জুন শেষে ব্যাংকটির মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৪ হাজার ৮৪১ কোটি টাকা। যা মোট বিতরণ করা ঋণের ২৭ দশমিক ৫১ শতাংশ। তবে বৈদেশিক ও বাণিজ্যিক ঋণের ৫০ শতাংশের বেশি খেলাপি। যে কারণে ব্যাংকের মোট খেলাপি ঋণ বাড়ছে বলে মনে করেন ব্যাংকের এমডি। বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে 

কৃষি ব্যাংকের স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের 

আওতায় খেলাপি ঋণ কমিয়ে ২০ শতাংশের মধ্যে নামানোর কথা।

এদিকে ব্যাংকটির ঋণ আদায়ও কমছে। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ব্যাংকের ঋণ আদায়ের পরিমাণ ছিল ৭ হাজার ৮৮২ কোটি টাকা। যা পরের অর্থবছরে (২০১৫-১৬) ৫৭০ কোটি টাকা কমে ৭ হাজার ৩১২ কোটি টাকায় নেমেছে। বৈদেশিক বাণিজ্য ও অকৃষি খাতে বিতরণ করা ঋণ আদায় না হওয়ায় মোট আদায় কম হয়েছে বলে মনে করেন ব্যবস্থাপনা পরিচালক। তিনি চিঠিতে বলেছেন, বৈদেশিক বাণিজ্য ও অকৃষি খাতে বিতরণ করা ঋণ আদায় সন্তোষজনক নয়। নানাবিধ প্রচেষ্টা সত্ত্বেও এই ঋণ আদায় হচ্ছে না। ব্যাংক আদালতের দারস্থ হয়ে খরচ বাড়িয়ে ফেলছে। ব্যাংকটির বার্ষিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০টি কোম্পানিকে কৃষি ব্যাংক ১ হাজার ৮৮০ কোটি টাকা ঋণ দিয়েছে। এরমধ্যে প্রায় ৭০০ কোটি টাকা মন্দ বা কুমানের ঋণে পরিণত হয়েছে। আরও ৩০০ কোটি টাকা খেলাপি হওয়ার পথে। প্রতিটি কোম্পানিকেই ব্যাংকের মোট মূলধনের ১০ শতাংশের বেশি ঋণ দেওয়া হয়েছে।

সর্বশেষ বাণিজ্যিক ঋণ বিতরণের সময়কালে কৃষি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান ছিলেন বিশিষ্ট ব্যাংকার খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ। জানতে চাইলে তিনি সমকালকে বলেন, অকৃষি খাতে ঋণ কৃষি ব্যাংক অনেক আগে থেকেই দিত। '৭৬ সাল থেকে শুরু হয়েছে। কৃষির পাশাপাশি অন্যান্য খাতে ঋণ বিতরণ করে মুনাফা করার একটা প্রচেষ্টা ছিল। আর অকৃষি খাতে বিতরণ করা সব ঋণ যে খারাপ হয়েছে, তা ঠিক নয়। তবে অকৃষি খাতে ঋণ বিতরণে কৃষি ব্যাংকের প্রধান দুটো সমস্যা রয়েছে। একটা হলো, ব্যাংকটিতে দুর্নীতি আছে; আরেকটি হলো, ব্যাংকের বেশিরভাগ কর্মী বৈদেশিক ও শিল্প ঋণ বিষয়ে অভিজ্ঞ নন। কর্মীদের দুর্নীতি ও অভিজ্ঞতাহীনতার কারণে বৈদেশিক বাণিজ্য ও অকৃষি খাতে ব্যাংকটি লাভ করতে পারেনি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের কৃষি ঋণ বিভাগের মহাব্যবস্থাপক প্রভাষ চন্দ্র মলি্লক সমকালকে বলেন, বাণিজ্যিক ঋণ দিয়ে সমস্যায় পড়ার কারণে এরই মধ্যে কৃষি ব্যাংকের অকৃষি খাতের ঋণ বিতরণ বন্ধ করতে বলা হয়েছে। ব্যাংকটি সে অনুযায়ী কার্যক্রম চালাচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক ঋণের আদায় পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে।