রবিবার, 02 অক্টোবর 2016 12:38

তুলা চাষে দিনবদলের স্বপ্ন

সমকাল || পার্বত্য চট্টগ্রামের আবহাওয়া ও মাটি তুলা চাষের জন্য খুবই উপযোগী। ব্রিটিশ আমলে এই অঞ্চল 'কার্পাস মহল' হিসেবে পরিচিত ছিল। সেই কার্পাস মহলে সমভূমির তুলা চাষ করে দিনবদলের স্বপ্ন দেখছেন লামার কৃষকরা। বান্দরবান তুলা উন্নয়ন বোর্ডের সহযোগিতায় চলতি বছর উপজেলার ৩২টি প্লটে প্রায় ১৫০ হেক্টর জমিতে সফলভাবে সমভূমির তুলা চাষ হয়েছে। ফলনও দারুণ হবে বলে আশাবাদী চাষিরা। তুলা চাষ সফল হলে লামা থেকেই দেশের মোট চাহিদার এক-পঞ্চমাংশ তুলা সংগ্রহ করা যাবে বলে জানান তুলা উন্নয়ন বোর্ডের কর্মীরা।

লামায় কয়েক যুগ ধরে অর্থকরী ফসল হিসেবে তামাকের চাষ হচ্ছে। অথচ তামাক স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। বর্তমানে তামাকের ভয়াবহ পরিণতির কথা জেনে সচেতন হয়ে উঠছেন চাষিরা। তারা তামাকের বদলে তুলা চাষে ঝুঁকছেন। স্থানীয় চাষি নুরুল ইসলাম জানান, এক বিঘা জমিতে তুলা চাষ করতে ১০-১৪ হাজার টাকা খরচ হয়। বিঘাপ্রতি ১১-১২ মণ তুলা উৎপাদন করা যায়। যার বাজার মূল্য প্রায় ৩০ হাজার টাকা। তুলা চাষে প্রায় দ্বিগুণ লাভ পাওয়া যায়। জানা যায়, তুলা চাষে প্রথম আগ্রহ প্রকাশ করেন রূপসীপাড়া ইউনিয়নের মুসলিমপাড়ার কৃষক মোহাম্মদ হোসাইন। তার দেখাদেখি একই ইউনিয়নের দুর্গম পাহাড়ি ছৌলুমঝিরির আবদুল হালিম, পূর্ব শীলেরতুয়া গ্রামের নুরুল ইসলাম, জমির হোসেন, আহমদ নবীসহ ৩২ জন কৃষক তুলা চাষ শুরু করেন। গত জুনে তারা ৪০ শতক জমিতে ৩২টি প্রদর্শনী প্লটের মাধ্যমে পরীক্ষামূলক তুলা চাষ শুরু করেন। সার্বিক সহযোগিতা দেয় তুলা উন্নয়ন বোর্ড। এসব প্লটের আওতায় পাহাড়ের ঢালে ও সমতল ভূমিতে তুলা চাষে ভালো ফলন দেখা দেওয়ায় আশাবাদী হয়ে উঠেছেন চাষিরা। 

বাংলাদেশে দুই প্রজাতির তুলা চাষ হয়ে থাকে, পাহাড়ি তুলা এবং সমভূমির তুলা। পাহাড়ি তুলা পার্বত্যাঞ্চলে জুম চাষে অন্য ফসলের সাথী ফসল হিসেবে চাষ করা হয়। জুম চাষিদের মূল অর্থকরী ফসল পাহাড়ি তুলা। সমভূমির তুলা পাহাড়ের ঢালে ও সমতল ভূমিতে চাষ হয়ে থাকে। পাহাড়ি তুলার আঁশের দৈর্ঘ্য ০.৫ ইঞ্চি। আঁশ খাটো বলে এই তুলা স্পিনিং মিলে সুতা তৈরির উপযোগী হয় না। জুম চাষিরা উৎপাদিত তুলার একটি অংশ নিজেদের জন্য কম্বল, মোটা কাপড় তৈরির কাজে ব্যবহার করেন। এ ছাড়া এই তুলার একটি অংশ লেপের তুলা হিসেবে ব্যবহার করা হয় এবং কিছু অংশ বিদেশে রফতানি করা হয়। সমভূমির তুলার আঁশের দৈর্ঘ্য গড়ে ১.১৫ ইঞ্চি। এই তুলা স্পিনিং মিলে সুতা তৈরির কাজে ব্যবহৃত হয়। এ ছাড়া তুলার বীজ থেকে পশুখাদ্য খৈল, ফ্যাটমুক্ত তেল ও ফাজ (ব্যন্ডেজ বা গজ) তৈরি করা হয়। গাছ জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা যায়।

পার্বত্যাঞ্চলের আবহাওয়া ও মাটি তুলা চাষের উপযোগী। ব্রিটিশ আমলে এই অঞ্চল 'কার্পাস মহল' হিসেবে পরিচিত ছিল। এই অঞ্চলে পাহাড়ের পাশাপাশি অনেক নদী ও ঝিরি রয়েছে। নদী ও ঝিরির পাড়ের অনুর্বর, বেলে দো-আঁশ মাটিতে সমভূমির তুলা ভালো হয়। এছাড়া সমভূমির তুলা পাতাঝরা উদ্ভিদ হওয়ায় গাছের মোট আয়তনের এক-তৃতীয়াংশ জৈব পদার্থ হিসেবে যোগ হয়। ফলে সমভূমির তুলা চাষে জমি উর্বরতা লাভ করে। জুন মাসের শেষের দিকে ও জুলাই মাসের প্রথম দিকে জমিতে তুলার বীজ বপন করার উপযুক্ত সময়। পাঁচ মাস পর নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসের মধ্যে তুলা উত্তোলন করা হয়। 

দেশের ৩৬৩টি সুতাকলে বার্ষিক ৪০ লাখ বেল আঁশ তুলার চাহিদা আছে। এ পরিমাণ তুলা আমদানি করতে বছরে প্রায় ১৮ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়। এ বিপুল পরিমাণ আঁশ তুলার চাহিদা পূরণের জন্য তুলা উন্নয়ন বোর্ড দেশের সমতল অঞ্চলের পাশাপাশি পার্বত্যাঞ্চলেও সমভূমির তুলা চাষ সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় বান্দরবান তুলা উন্নয়ন বোর্ডের সম্প্রসারিত তুলা চাষ প্রকল্পের (ফেজ-১) আওতায় লামা উপজেলার গজালিয়া, ফাঁসিয়াখালী ও রূপসীপাড়া ইউনিয়নে ৩২টি পরীক্ষামূলক প্রদর্শনীর মাধ্যমে ১৫০ হেক্টর পাহাড়ি ও সমতল ভূমিতে সিবি-১২ ও ১৪ জাতের তুলা চাষ করা হয়। এর আগে চাষিদের তুলা চাষের ওপর প্রশিক্ষণ ও বিনামূল্যে বীজ, সার, কীটনাশক ও উপকরণ প্রদান করে তুলা উন্নয়ন বোর্ড। 

গত ২০ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম তুলা উন্নয়ন বোর্ডের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ মো. আবু ইলিয়াছ মিয়া সৃজিত তুলা প্রদর্শনী প্লট পরিদর্শন করেন। এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন বান্দরবান তুলা উন্নয়ন জোনের প্রধান কৃষিবিদ আবদুল ওহাব, কটন ইউনিট কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. শফিকুল ইসলাম, লামা কটন ইউনিট কর্মকর্তা আবদুল খালেক। মাঠ পরিদর্শনের সময় তুলা চাষি মো. হোসাইন, মো. হালিম, নুরুল ইসলাম, জমির হোসেন, আহমদ নবীসহ অনেকে উপস্থিত ছিলেন। প্রদর্শনী প্লট পরিদর্শন শেষে তুলা উন্নয়ন বোর্ড চট্টগ্রাম আঞ্চলিক কার্যালয়ের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ মো. আবু ইলিয়াছ মিয়া বলেন, 'চলতি মৌসুমে লামা ইউনিটের অধীনে ১৫০ হেক্টর জমিতে দেশি ও হাইব্রিড জাতের সমভূমি তুলা চাষের আবাদ করা হয়েছে। তবে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২০০ হেক্টর। প্রাকৃতিক বিপর্যয় না হলে ভালো ফলন হবে বলে আমরা আশাবাদী।'তিনি আরও বলেন, 'স্থানীয় চাষিরা আগে তামাক চাষে অভ্যস্ত ছিল। সময় পরিবর্তনের সাথে সাথে কৃষিপণ্য উৎপাদনের ধরন পাল্টেছে। এখন তামাকের পরিবর্তে কৃষকদের তুলা চাষে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে, বেশ সাড়াও পাওয়া যাচ্ছে।' 

উপজেলার রূপসীপাড়া ইউনিয়নের মুসলিমপাড়ার সমভূমি তুলা চাষি আবু জাফর জানান, আগে তিনি তামাক চাষ করতেন। তুলা উন্নয়ন বোর্ডের পরামর্শে চলতি মৌসুমে আড়াই কানি (এক একর) সমতল ভূমিতে তুলা চাষ করেছেন। ফলনও ভালো হয়েছে। সরকারি সহায়তায় লামা উপজেলার পতিত জমিতে ব্যাপক তুলা চাষের উজ্জ্বল সম্ভাবনা রয়েছে।