সোমবার, 16 মে 2016 11:47

ধান পেকেছে, কাটার শ্রমিক নেই

রাজশাহীর বরেন্দ্র অঞ্চল

প্রথম আলো || বরেন্দ্র অঞ্চলে কৃষিশ্রমিক সংকটের কারণে কষ্টের ধান ঘরে তুলতে হিমশিম খাচ্ছেন কৃষকেরা। মৌসুম শেষ হতে চললেও তাই ধান কাটা শেষ হয়নি। স্বল্পসংখ্যক শ্রমিক থাকায় তাঁদের মজুরিও চড়া। তাই শ্রমিক পেলেও ধান কেটে লাভের মুখ দেখছেন না কৃষকেরা। কৃষক ও কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, এ অঞ্চলে কৃষিশ্রমিক সংকটের পেছনে রয়েছে পেশা পরিবর্তন। মৌসুমি কাজের ভরসায় না থেকে মানুষ অন্য কাজে চলে যাচ্ছেন। কয়েক বছর ধরে এই পেশা পরিবর্তনের কারণে এবার ধান কাটা নিয়ে বিপাকে পড়েছেন কৃষক। কৃষিকে যান্ত্রিকীকরণ ছাড়া এ সমস্যা থেকে উত্তরণের পথ দেখছে না কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, সরকার এ জন্য ‘খামার যান্ত্রিকীকরণ প্রকল্প’ হাতে নিয়েছে। প্রকল্পের আওতায় ‘কম্বাইন্ড হারভেস্টর’ নামের একটি যন্ত্র এ বছর কৃষকদের দেখানো হচ্ছে। ৩০ শতাংশ ছাড়ে যন্ত্রটি প্রকল্পের আওতায় কৃষকদের সরবরাহ করা যাবে। তবে দাম বেশি হওয়ায় কৃষকেরা এটি কিনতে পারছেন না।

গত শনিবার রাজশাহীর তানোর উপজেলার চান্দুড়িয়া এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, নিজের জমির নষ্ট ধান কেটে পরিষ্কার করছেন কৃষক ইব্রাহিম খলিল। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, তাঁর জমির ধানে ছত্রাকের সংক্রমণ হয়েছে। কিন্তু কাজের জন্য শ্রমিক পাননি। যে অল্পসংখ্যক শ্রমিক আছেন, তাঁরা এক বিঘা জমির ধান কাটতে সাড়ে তিন হাজার টাকা করে নিচ্ছেন। এই পরিমাণ টাকা দিতে হলে সাত মণ (এ অঞ্চলে ২৮ কেজিতে এক মণ) ধান বিক্রি করতে হবে। এ ছাড়া তাঁরা নিজের সুবিধামতো দিনে ধান কাটবেন। তানোরের দেওতলা গ্রামের কৃষক গোলাম মোস্তফা বলেন, এক বিঘা জমি আবাদ করতে ছয় হাজার টাকা খরচ হয়েছে। এখন ধান কাটার লোক পাওয়া যাচ্ছে না। শ্রমিকদের একটি অংশ স্বাবলম্বী, আর কেউ কেউ শহরে গিয়ে কাজ করছেন। যাঁরা আছেন, তাঁরা ধান কাটার জন্য চড়া দাম হাঁকছেন। কাছের জমি বিঘাপ্রতি সাড়ে তিন ও দূরে হলে চার হাজার টাকা চাইছেন।

রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্র বলেছে, এবার রাজশাহীতে ধানের ফলন ভালো হয়েছে। লক্ষ্যমাত্রাও অর্জিত হয়েছে। এখনো ৫ শতাংশ জমিতে ধান রয়েছে। তবে শ্রমিক সংকটের কারণে কৃষকেরা চিন্তিত। অধিদপ্তর জমিতে ৫ শতাংশ জমির ধান কাটা বাকি বললেও বাস্তবে এর পরিমাণ আরও বেশি বলে কৃষকদের সূত্র বলেছে। তানোর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম বলেন, কৃষি কষ্টের কাজ। সারা দিন রোদে পুড়ে এই কাজ করে ৩০০ টাকা পাওয়ার চেয়ে শহরে গিয়ে অটোরিকশা চালিয়ে ২০০ টাকা পেলেও শরীরটা আরামে থাকে। মানুষের মধ্যে পেশা পরিবর্তনের এই প্রবণতা বাড়ছে।

চান্দুড়িয়া বাজারের কৃষক ও ব্যবসায়ী রফিকুল ইসলাম বলেন, তাঁদের গ্রামের মিনারুল ইসলাম (২০) ও রফিকুল ইসলাম (৩৫) আগে খেতে কাজ করতেন। এখন তাঁরা রাজশাহী শহরে রাজমিস্ত্রির কাজ করেন। আগে খেতে কাজ করা আরও বেশ কয়েকজন এখন শহরে অটোরিকশা চালান। তিনি বলেন, স্থানীয় বাজারে ব্রি-২৮ জাতের ধান বিক্রি হয়েছে ১৭ টাকা ১৪ পয়সা কেজি দরে, আর জিরা ধান ১৭ টাকা ৮৫ পয়সা কেজি দরে। অথচ সরকার ২৩ টাকা দর বেঁধে দিয়েছে। সরকারি দরে ধান বিক্রি করতে পারলেও ধান বেচে শ্রমিকের খরচ মেটানো যেত। কিন্তু এখন এই অঞ্চলের কৃষক শুধু ধানের খড়ের মালিক।

গোদাগাড়ী উপজেলার প্রসাদপাড়া গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, কিষানি মেহেরুন নেসা নিজেই শ্রমিকদের সঙ্গে পানি থেকে ধান উঠাচ্ছেন। তিনি বলেন, তাঁর সাড়ে চার বিঘা জমির ধান কাটার জন্য শ্রমিক পাচ্ছিলেন না। চাঁপাইনবাবগঞ্জের দিয়াড় এলাকা থেকে শ্রমিকেরা এসে এমন দিনে ধান কাটা শুরু করলেন, তার পরদিন থেকে বৃষ্টি শুরু হলো। ধান পাঁচ দিন ধরে জমিতে পানির ভেতর পড়েছিল। মেহেরুন নেসা বলেন, কথা ছিল ২০ মণ ধান কাটলে পাঁচ মণ শ্রমিকদের দিতে হবে। এখন বৃষ্টির জন্য শ্রমিকদের সাত মণ দিতে হচ্ছে। কৃষি কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম বলেন, কৃষিশ্রমিক সংকটের বিষয়টি মাথায় রেখেই ‘খামার যান্ত্রিকীকরণ প্রকল্প’ হাতে নিয়েছে সরকার। ‘কম্বাইন্ড হারভেস্টর’ দিয়ে ধান কেটে মাঠেই বস্তাবন্দী করা যাবে। তবে এর দাম বেশি হওয়ায় কৃষকেরা কিনতে পারছেন না। তবে শুধু ধান কাটার জন্য ‘রিপার’ নামে আরেকটি যন্ত্র রাজশাহীর কয়েকজন কৃষক কিনেছেন। ধীরে ধীরে এই যন্ত্র জনপ্রিয় হবে।