রবিবার, 18 জানুয়ারি 2015 12:51

ধানসহ ফসলের ন্যায্যমূল্য দিতে হবে

বাংলাদেশের বেশির ভাগ মানুষ গ্রামে বাস করেন আবার তাদের বেশিরভাগ কৃষি কাজে নিয়োজিত দেশের এই উৎপাদক কৃষক শ্রেণি নিজের জীবন ধারনের নিশ্চয়তা না পেলেও তারা সর্বশ্রেনীর মানুষের খাদ্যের জোগান দিয়ে চলেছেন কৃষিতে মুক্ত বাজার অর্থনীতির প্রভাব, জলবায়ুর অভিঘাতের চ্যালেন্স রাষ্ট্রীয় উদাসীনতার কারনে বাংলাদেশের কৃষিখাত বহুমাত্রিক সমস্যায় জর্জরিত কৃষিতে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, বহুজাতিক কোম্পানির বীজ, সার, কীটনাশক, যান্ত্রিক সেচ নির্ভরতায় কৃষির বিকাশ রুদ্ধ হচ্ছে এবং ফসলের ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় কৃষক আর কৃষিতে টিকতে পারছে না

দেশের বিদ্যমান কৃষি বাজার ব্যবস্থাপনা ক্রুটিপূর্ণ এটি একশ্রেণির আড়তদার, ফড়িয়া মধ্যস্বত্বভোগীদের নিকট জিম্মি উৎপাদনের প্রয়োজনীয় উপকরণ ক্রয় থেকে শুরু করে উৎপাদিত পণ্য বিক্রয় পর্যন্ত সকল ক্ষেত্রেই কৃষক প্রতারিত হচ্ছেন সরকার প্রতি বছর ধান ওঠার পর তার দাম নির্ধারণ সংগ্রহের কার্যক্রম পরিচালনা করেনকিন্তুধান সরবারহ করতে প্রকৃত কৃষক ওই দাম পান না বাংলাদেশ সরকারের অভ্যন্তরীন খাদ্যশস্য সংগ্রহ নীতিমালা-২০১০ এর ধারা () অনুসরণ করা হয় না এটি সব সরকারের আমলেই ক্ষমতাসীন দলের নেতা কর্মীদের নিয়ন্ত্রনে থাকে তারা কৃষকের নামে নিজেরাই গুদামে ধান সরবারহ করে এমনটিও দেখা যায় যে, প্রকৃত কৃষক নিজের ধান নিজেই সরাবরাহ করতে চাইলে ক্রয় স্লিপ বাবদ নেতা এবং ধান বুঝে নেবার জন্য সংগ্রহকারী কর্তৃপক্ষের স্থানি প্রতিনিধিকে কমিশন দিতে হয় এই প্রক্রিয়ার বাইরে কৃষক কখনই যেতে পারে না কেননা শস্যের গুনগত মান খারাপ, ধান ভালোভাবে শুকনা নয়, ময়লা চিটা-ধুলাসহ নানা অজুহাতে ধান ফেরত পাঠিয়ে দেবার ক্ষমতা ওদের হাতে সংরক্ষিত এভাবেই অবৈধ কমিশনের মাধ্যমে নেতারা এবং নেতাদের মাধ্যমে কর্মকর্তারা পকেট ভারী করছে এসব কারনে কৃষকরা ফসল উৎপাদনে প্রকৃত মূল্য থেকে বঞ্চিত হন এমনকি বিনিয়োগকৃত অর্থও তুলতে পারছেন না তাঁদের শ্রম ঘামের ফসল লুট হয়ে যাচ্ছে

খাদ্য বিশেষ করে ধান উৎপাদনে আমরা স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছি-এটা জোরে-শোরে বলা হচ্ছে অবশ্যই ধানের উৎপাদন বিগত কয়েক দশকে বহুগুন বেড়েছে চাহিদা, যোগান উৎপাদন ব্যয়ের উপর নির্ভর করে পণ্যের বাজার মূল্য নির্ধারিত হওয়ার কথা থাকলেও মৌসুম শেষে যখন কৃষকের ঘরে ফসল আসে দূর্ভাগ্যক্রমে তখন দাম কমে যায়, অধিক উৎপাদন মানেই যেন চাহিদার তুলনায় বেশী জোগান, ফলে বাজার মূল্য কম হওয়াই স্বাভাবিক এমন একটি অন্যায় ব্যবস্থাপনাকৃষিতে প্রচলিত এতে ধান উৎপাদন  ক্ষতিগ্রস্তহচ্ছে এবং পরবর্তী মৌসুমে উৎপাদনের আগ্রহ কৃষক হারিয়ে ফেলছে বাজার ব্যবস্থাপনা উপর কৃষকের কোন নিয়ন্ত্রন না থাকার ফলে কৃষক উৎপাদন থেকে কোন লাভ তো দূরের কথা শ্রমসহ অন্যান্য ব্যবহৃত উপকরণের মূল্যই উঠাতে পারছে না বাজার নিয়ন্ত্রনকারী মধ্যস্বত্বভোগীরা একদিকে যেমন পানি, বীজ, সার, কীটনাশকসহ অন্যান্য কৃষি উপকরণ বিক্রি করে ইচ্ছামতো মুনাফা হাতিয়ে নিচ্ছে, অন্যদিকে সকল ব্যয়ভার ঝুঁকি কাঁধে নিয়ে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে কৃষক যা উৎপাদন করছে তার প্রাপ্য অংশটাও পাচ্ছে না যে পণ্য লোকসানে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছে কৃষক সে পণ্য থেকেই কয়েকগুণ লাভ তুলে নিচ্ছে মধ্যস্বত্বভোগীরা ফরিয়া, মহাজন, আড়তদার, মজুদদার, ব্যবসায়ী, বীজ সার কীটনাশক কোম্পানী ব্যবসায়ী, চাতাল মালিক, হাটবাজারের ইজারাদার, ব্যাংকের দালালচক্র, ঋণ ব্যবসায়ী এনজিও মিলে চারদিক থেকে কৃষককে এক শোষণ-শৃঙ্খলে বন্দী করে উৎপাদনের সুফল টুকু লুটে-পুটে খাচ্ছে এধরণের বাজার ব্যবস্থাপনারকারণে কৃষক দিন দিন নিঃস্ব হচ্ছেন বাণিজ্যিক বিশ্বায়নের প্রেক্ষাপটে কৃষির বর্তমান ধারার বাণিজ্যিকীকরণ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ ক্ষুদ্র, প্রান্তিক ভূমিহীন কৃষকদের জন্য মারাত্মক বিপর্যয় ডেকে আনছে প্রতিনিয়ত

এই প্রেক্ষাপটে ধানসহ কৃষি পণ্যের ন্যায্য মূল্য প্রাপ্তির জন্য আমাদের দাবিসমূহ:

বাংলাদেশের বিশাল জনগোষ্ঠীর জন্য খাদ্যের নিশ্চয়তা কর্মসন্থানের ধারাবাহিকতা রক্ষা তথা জাতীয় উন্নয়নে কৃষিকে স্বনির্ভর খাতে উন্নীত করতেকৃষি পণ্যের মূল্য কমিশনগঠন করতে হবে

উৎপাদন খরচ, শ্রমের মূল্য মুনাফার সমষ্টির ভিত্তিতে ধানসহ বিভিন্ন ফসল তোলার মৌসুমে সরকার কর্তৃক ফসলের ন্যায্য মূল্য নির্ধারণ করে দিতে হবে এবং সরকার কর্তৃক ন্যায্য মূল্যে চাতালমালিক থেকে চাল নয়, প্রকৃত কৃষকের নিকট থেকে ধান ক্রয় করতে হবে

সরকারী খাদ্য শস্য সংগ্রহ নীতিমালা ২০১০ ক্রুটিমূক্তিকরণ এবং এর সাথে সংশিৱষ্ট সরকারী কর্মচারীদের দূর্নীতির অবসান করতে হবে শস্য সংগ্রহে রাজনৈতিক নেত্রীবর্গের কোটা পদ্ধতি বাতিল করতে হবে

সরকারীভাবে ধানসহ শস্য ক্রয় করার ক্ষেত্রে ওজনের কারচুপি রোধ করতে হবে কৃষকরা যাতে ধান/শস্য বিক্রি করতে এসে অনর্থক হয়রানি তাদের মূল্যবান কর্মদিবস নষ্ট হওয়ার মুখোমুখি না হতে হয়, তার ব্যবস্থানিতে হবে

ফসলের মূল্য প্রাপ্তি নিশ্চিত করার জন্য উৎপাদন মৌসুমের শুরুতেফসলের লাভসহ মূল্য আগাম ঘোষণা করতে হবে

কৃষি উপকরণের মূল্য কমানো, কৃষিখাতে ভর্তুকি বৃদ্ধি, ভর্তুকি প্রদানের খাত প্রক্রিয়াগত নির্দেশনা প্রনয়ণ এবং তা দ্র্বত বাস্তবায়ন করতে হবে

কৃষি পণ্যের বাজারজাতকরণ এবং ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করতে ইউনিয়ন পর্যায়ে উৎপাদকদের যৌথ বাজার গড়ে তোলার লক্ষ্যে রাষ্ট্রকে কার্যকর নীতি প্রনয়ণসহ পূঁজি ও প্রযুক্তি সহায়তা নিতে হবে।

জ.উৎপাদনকারী এবং সরকারি ক্রয় কেন্দ্রের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে সরকারকে সুবিধাজনক স্থানেওয়ানষ্টপ সার্ভিসের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

বাংলাদেশ ভূমিহীন সমিতি