শনিবার, 04 এপ্রিল 2015 00:00

সারে যদি সারবস্তুর ঘাটতি থাকে

সংবাদ ।। ড. জীবন কৃষ্ণ বিশ্বাস ।। ক'দিন আগে আমাদের মাঠে (ব্রি) গিয়ে মনটা খারাপ গেল। ধানের গাছগুলো যতটা সবুজ হওয়ার কথা ছিল ততটা সবুজ দেখাচ্ছিল না। অথচ এমনটি হওয়ার কথা নয়। সঙ্গে সঙ্গে অনুসন্ধানী দল গঠন করে দেয়া হয়। বড়-ছোট সবাইকে দিয়ে। উদ্দেশ্য; বড়রা অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করবে আর ছোটরা শিখবে। আমাদের ধারণা ছিল বিষয়টি তেমন কিছু গুরুত্বপূর্ণ নয়। কিছুদিন আগে ঠান্ডার ভাব ছিল; তার কিছুটা রেশ হয়তো রয়ে গেছে। আমাদের অনুসন্ধানী দল মাঠ পরীক্ষা করে, গাছের ঐঁহমবৎ ংরমহ গুলো পরীক্ষা করে। জমির ইতিহাস পর্যালোচনা করে। অতঃপর তারা উপসংহারে আসে যে পরীক্ষাধীন জমির ধানের গাছগুলো নাইট্রোজেন ও পটাশের অভাবে ভুগছে। এর অর্থ এই যে এসব জমিতে ইউরিয়া এবং মিউরেট অব পটাশ সার দেয়া হয়নি বা দেয়া হলেও কম দেয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট মাঠ-ব্যবস্থাপক বিজ্ঞানীদের জিজ্ঞাসা করা হলো। তারা জানালো যে সার পরিমাণ মতই দেয়া হয়েছে। তাহলে সমস্যা কোথায়? আমরা জানি কী কী কারণে ধানের জমিতে নাইট্রোজেনের অভাব দেখা দিতে পারে। যেমন জমিতে আদতেই নাইট্রোজেন কম থাকা বা জৈব পদার্থ কম থাকা ইত্যাদি ইত্যাদি।এসব পরিস্থিতি আমাদের জমির বেলায় স্বাভাবিক। অতএব জমিতে যদি নাইট্রোজেন কম দেয়া হয় তাহলে এমন অভাব দেখা দিতে পারে। বা জমিতে নাইট্রোজেন সার দেয়ার পর ভালো ব্যবস্থাপনার অভাবে নাইট্রোজেন উড়ে যাওয়া, পানির সঙ্গে ধুয়ে যাওয়া বা মাটির নিচে চলে যাওয়া; এসব কারণেও গাছ নাইট্রোজেনের অভাবে ভুগতে পারে। জমি যদি সব সময়ের জন্য পানিতে ডুবে থাকে বা কিছু দিনের জন্য শুকিয়ে কাঠ হয়ে যায় তাহলেও এমন পরিস্থিতির উদ্ভব হতে পারে। কিন্তু আমাদের জমিতে এগুলোর কোন অবস্থারই শিকার হওয়ার সুযোগ নেই। অতএব প্রয়োগকৃত সারগুলোর অবশেষ নমুনাগুলো পরীক্ষা করা যায়। তাই করা হলো। আমাদের মাঠে দেয়া ইউরিয়ার নমুনাদিব্যি ইউরিয়ার মতই। তাই সন্দেহ করার কিছু নেই। পটাশ সারের রং উঠে যায় হাতে নিলে। অতএব এ সারের প্রাথমিক পরীক্ষাগুলো করা হয়েছিল মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট প্রচারিত প্রেসক্রিপশন মোতাবেক। তারপরও আমাদের রাসায়নিক পরীক্ষাগারে আবার বিস্তারিত পরীক্ষা করা হয়। সেই পরীক্ষার ফলাফল ছিল অভূতপূর্ব। যেমন ইউরিয়া সারে ৪৬ শতাংশ নাইট্রোজেন থাকার কথা, আছে ২১ শতাংশ।
টিএসপিতে ফসফরাস ২০ শতাংশ থাকার কথা। আছে ১৫ শতাংশ। আর যে মিউরেট অব পটাশ পুরোপুরোই ভেজাল বলে মনে হয়েছিল তাতে পটাশের মাত্রা ছিল সঠিক। অর্থাৎ ৫০ শতাংশ। ভুল হতে পারে মনে করে কয়েকবার বিশ্লেষণ করা হয়। ফলাফল একই। তাহলে বাজারের কিছু ইউরিয়া এবং পটাশ সারে কী সারবস্তুর ঘাটতি ছিল?আমরা যেখান থেকে সার কিনেছিলাম তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করি। বহুদিনের সার সরবরাহকারী স্থানীয় এবং পরিচিত ডিলার। আমাদের সঙ্গে তঞ্চকতা করবে বলে আমরা মনে করি না। তাকে সব কথা বলা হলো। তিনি তেমন সদুত্তর দিতে পারেননি। তবে জানালেন যে তাদের থেকে যেসব চাষি ইউরিয়া সার নিয়েছেন, তাদেরও দুয়েকজন এ ধরনের কিছু অভিযোগ করেছেন। তাহলে কি ধরে নেব সার থেকে কিছু সারবস্তু উড়ে গেছে! প্যাকিং খারাপ হলে এমন হতে পারে বোধহয়। জট বা দলা বেঁধে যেতে পারে।আমরা জানি সার উড়ে গেলে বস্তা পিছু কিছু ওজন কমে যায়। প্রতি বস্তায় পঞ্চাশ কেজি ইউরিয়া থাকে। আমাদের এ সারের ওজন কমেছে বস্তাপ্রতি মাত্র এক কেজি মাত্র। সেটা অস্বাভাবিক কিছু মনে হয়নি। অস্বাভাবিক মনে হয়েছে নাইট্রোজেনের শতকরা হার কমে যাওয়া। এ মুহূর্তে আমার মাথায় আসছে না কীভাবে সেটা সম্ভব। সার তো ঘোড়াশালের তৈরি বলে শুনেছি। তবে বস্তার গায়ে প্যাকিং তারিখ নেই। থাকলে ভালো হতো। এটা যদি দৈব-দুর্বিপাকজনিত ঘটনা হয় তাহলে কিছু বলার নেই। অথবা যদি শুধু আমাদের কেনা নমুনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে তাহলেও কিছু বলার নেই।আমরা জানতে পেরেছি সময়মতো। তাই অতিরিক্ত সার জমিতে দিয়ে এ ক্ষতি কিছুটা পুষিয়ে নিতে পেরেছি বলে মনে হচ্ছে। কিন্তু চাষিরা যদি সত্যি এ অবস্থার মুখোমুখি হয়ে থাকে তাহলে কিন্তু চিন্তার বিষয়। এখানে একটি বিষয় লক্ষ্য করার মতো। প্রয়োগকৃত ইউরিয়া সারে নাইট্রোজেনের পরিমাণ প্রচলিত পরিমাণের অর্ধেক। অতএব জমিতে নাইট্রোজেনের ঘাটতি হওয়া স্বাভাবিক। তবে প্রয়োকৃত পটাশ সারে পটাশের কোন ঘাটতি নেই। তাহলে পটাশের অভাব দেখা দিল কেন? আমার বিশ্বাস বাজারে প্রচলিত ইউরিয়ার মান ঠিক আছে। আমাদের এখানে সংগৃহীত লটে দৈবক্রমে এমনটি ঘটেছে, যা আমি বলেছি। তবে এমনটি যে বড় আকারে ঘটতে পারে না এমন নয়। তাই ধান-বিজ্ঞানীদের একজন হিসাবে বিষয়টি নিয়ে কিছু বলতে হয়।প্রথমেই জানার আছে নাইট্রোজেন, ফসফরাস এবং পটাশ ধান গাছের কী কাজে লাগে। নাইট্রোজেন গাছের সবুজ কণিকা ক্লোরোফিল (এখানেই শ্বেতসার প্রস্তুত হয়), অ্যামাইনো এসিড (প্রোটিনের উপাদান), নিউক্লিক এসিড, নিউক্লিওটাইড (জীবনের অস্তিত্ব নির্ধারণকারী জিন-কণিকার উপাদান) ইত্যাদির অন্যতম উপাদান। নাইট্রোজেনের সঙ্গে কুশি হওয়া, পাতার আকৃতির পরিবর্তন, ফটোসিনথেসিসের নিবিড় সম্পর্ক। এদের আবার সরাসরি সম্পর্ক ফলনের সঙ্গে। ফসফরাস শক্তিদায়ক অনু এটিপি (অ্যাডিনোসিন ট্রাই ফসফেট), জিন এর উপাদান নিউক্লিক অ্যাসিড, নিউক্লিওটাইড গঠনে ভূমিকা রাখে। গাছের কুশি বর্ধক, মূলের বৃদ্ধি, প্রস্ফুটন, ইত্যাদিতে সাহায্য করে ফসফরাস। গাছের বৃদ্ধির প্রথম পর্যায়ে এ উপাদানের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। কোষের অভিস্রবণ নিয়ন্ত্রণ, এনজাইম সক্রিয়করণ, কোষের মধ্যে ধনাত্মক এবং ঋণাত্মক আয়নের ভারসাম্য নির্বাহ, পত্ররন্ধ্র নিয়ন্ত্রণ, কোষের অমস্ন এবং ক্ষারের মান নিয়ন্ত্রণ, ফটোসিনথেসিসের ফলে উদ্ভূত খাদ্যদ্রব্য পরিবহন, পাতার আকৃতি বৃদ্ধি সহ পাতার ক্লোরোফিল বৃদ্ধি, ফসলের বাড়-বাড়তি ইত্যাদি প্রক্রিয়ায় পটাশের ভূমিকা অন্যতম।গাছের জন্য দরকারি এ পদার্থগুলো প্রকৃতপক্ষে একে অপরের সহায়তা নিয়ে সমন্বিত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে গাছের জন্য কাজ করে থাকে। তবে প্রধান শর্ত হলো কোনক্রমেই একটির পাশাপাশি আরেকটির ঘাটতি থাকা চলবে না। অর্থাৎ গাছের জন্য সার্বক্ষণিক সরবরাহ নিশ্চিত করতে হলে মাটির দ্রবণে অবশ্যই এগুলো সব সময়ের জন্য পরিমিত পরিমাণে রিজার্ভ থাকতে হবে।আমরা জানি আমাদের মাটিতে গাছের প্রধান খাদ্যোপাদানগুলো যথেষ্ট পরিমাণে থাকে না। তাই বাইরে থেকে বিভিন্নভাবে বিভিন্ন উপায়ে মাটিতে গাছের খাদ্যোপাদানগুলো সরবরাহ করতে হয়। এগুলোই হলো সার। শিকড়ই গাছের অন্যতম খাদ্য গ্রহণের মাধ্যম এবং গাছ মাটির দ্রবণ থেকে এ খাদ্যগুলো বিভিন্ন ধরনের আয়ন (এক্ষেত্রে চার্জড-অণু বা খাদ্যোপদান) দেয়া-নেয়ার মাধ্যমে গ্রহণ করে থাকে। তাই মাটির দ্রবণে এ আয়নগুলো যথেষ্ট পরিমাণের থাকতে হবে। আবার যথেষ্ট পরিমাণ নাইট্রোজেন-ফসফরাস বা পটাশিয়াম আয়ন থাকলেই যে মাটির দ্রবণে এগুলোর প্রাপ্যতা গাছের জন্য সহজ হবে এমন নয়। দ্রবণের কর্দম কণিকার স্বভাবের ওপর এগুলো নির্ভর করে। কণিকগুলো তাদের ধরন অনুসারে আয়নকে মাটির মধ্যে ধরে রাখে (ঋরীধঃরড়হ ংরঃবএ ঋরী হওয়া)। এই ধরে রাখার ব্যাপারে বিভিন্ন ধরনের একই প্রকৃতির চার্জযুক্ত খাদ্যোপদান (নাইট্রোজেনের বেলায় যেমন ঘঐ৪+ , পটাশের বেলায় ক+: দুটোই ধনাত্মক চার্জযুক্ত) পরস্পরের মধ্যে প্রতিযোগিতা করে। ফলে একের প্রভাবে মাটির দ্রবণে আরেকটির পরিমাণ বেড়ে যায়।উদাহরণস্বরূপ ইউরিয়া প্রয়োগ করার ফলে মাটির দ্রবণে ঘঐ৪+ বেড়ে যায়। ফলে এ নির্দিষ্ট আয়ন কর্দম কণার ঋরীধঃরড়হ ংরঃবএ ঋরী হওয়ার ফলে মাটির দ্রবণে তুলনামূলক ঘঐ৪+ আয়ন বেড়ে যায়। আবার এর উল্টোটাও হতে পারে। যেমন এ ক+ আয়ন বেড়ে যাওয়ায় মাটির দ্রবণে ঘঐ৪+ আয়ন বেড়ে যেতে পারে। অর্থাৎ এ দুটি আয়ন একটি আরেকটিকে প্রভাবিত করছে। সোজা কথায় ইউরিয়া জমিতে দিলে পটাশ সারের কার্যকারিতা বাড়বে বা পটাশ দিলে ইউরিয়া সারের কার্যকারিতা। ধানের জমিতে সুষম মাত্রায় সার প্রয়োগে এমনই হওয়ার কথা। অতএব মাটির দ্রবণে উপরোক্ত আয়ন দুটির কোন একটির অভাব হয় তাহলে তাহলে সমসংস্থা অপর আয়নটিরও অভাব হতে বাধ্য। কারণ কর্দম কণিকায় ঋরীধঃরড়হ ংরঃবএ ঋরী হওয়ার জন্য প্রতিযোগিতা না থাকায় মাটির দ্রবণের সহজ প্রাপ্য আয়নগুলো তড়িঘড়ি ঋরী হয়ে যায়। এখানে ইউরিয়া সারে নাইট্রোজেনের পরিমাণ সুপারিশকৃত পরিমাণের অর্ধেক। অতএব মাটির দ্রবণে অবশ্যই ঘঐ৪+ আয়নের অভাব দেখা দিয়েছে। পাশাপাশি প্রতিযোতিার অভাবে পটাশ প্রয়োগ করার পরও মাঠের দ্রবণে ক+ আয়নের প্রাপ্যতা বেশি থাকায় সহজেই কর্দম কণিকার ঋরীধঃরড়হ ংরঃবএ ঋরী হয়ে হয়ে গেছে। ফলে মাটির দ্রবণে পটাশের এর ঘাটতি দেখা দিয়েছে এবং গাছ যথেষ্ট পরিমাণে পটাশও নিতে পারেনি। যার জন্য আমাদের জমিতে একই সঙ্গে নাইট্রোজেন এবং পটাশিয়ামের অভাব দেখা দিয়েছে।এখানে একটি বিষয় উল্লেখ করতে চাই, গাছে নাইট্রোজেনের অভাবের কথা আগে মনে রাখতে হবে। নাইট্রোজেনের ঘাটতি হলে শুধু যে পটশিয়ামের উপযোগিতা কমে যাবে এমন নয়; সহযোগী আরও সব খাদ্যোপদানের প্রাপ্যতাও কমে যেতে পারে। নাইট্রোজেন শিকড় থেকে শুরু করে গাছের সব বাড়-বাড়তির প্রাথমিক কাজটা শুরু করে দেয়। তারপরের কাজগুলো তা টেনে নিয়ে চলে পটাশ, ফসফরাস এবং আরও সব প্রয়োজনীয় খাদ্যোপদানগুলো। অতএব ভালো ফসলের জন্য অবশ্যই নাইট্রোজেনসহ সুষম মাত্রার সার প্রয়োগ বা প্রয়োগের পরে সুষম মাত্রায় গাছ যেন সেগুলো গ্রহণ করতে পারে সেদিকে অবশ্যই খেয়াল করতে হবে।শেষ কথা। এবারে ব্রির বেলায় এমনটি ঘটেছে বলে বিষয়টি কৃষিবিজ্ঞানীদের গোচরে আনার চেষ্টা করেছি। তবে দেশের অন্য কোথাও এমনটি ঘটেছে বলে শোনা যায়নি। আমি আগেই বলেছি ঘটনাক্রমে কিছু লটের বেলায় এমনটি হয়ে থাকতে পারে যা এবারে ব্রির ঘাড়ে চেপেছে এবং ভালোই হয়েছে বলে আমি মনে করি। কারণ জানা গেল যে মাঝে মধ্যে এমনটি হতেও পারে। [লেখক : মহাপরিচালক, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট]