রবিবার, 24 মে 2015 16:00

কৃষকের গোলায় ধান সংরক্ষণ প্রসঙ্গ

ড. নিয়াজ পাশা | দৈনিক ইত্তেফাক || সময় মতো কৃষির সর্বোপকরণ সরবরাহে নিশ্চয়তা এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হওয়ায় সারাদেশে বিশেষ করে হাওর-ভাটি এলাকায় এ বছর বোরো ধানের বাম্পার ফলন হয়েছে। খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে এ এক মাইল ফলক। কিন্তু কবি গুরু রবির ভাষায় বলা যায়,...‘ধান কাটা হলো সারা... ঠাঁই নাই, ঠাঁই নাই; আমারই সোনার ধানে গিয়েছে ভরি’... অবস্থা । সর্বত্রই রাশি রাশি ধান। সরকারি গুদামে ঠাঁই নাই বলে সরকার বেশি পরিমাণে ধান কিনতে পারছে না। হাওর এলাকাসহ সর্বত্র অত্যন্ত কম দামে ধান বিক্রয় হচ্ছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে কৃষি উত্পাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। সরকারি ব্যবস্থাপনায় কৃষকের গোলায় ধান সংগ্রহ ও সংরক্ষণে আমাদের কিছু প্রস্তাবনা সদয় বিবেচনার জন্য উপস্থাপন করছি। সারা দেশে সাড়ে ছয় হাজারের বেশি ইউনিয়ন, বিশ হাজারের বেশি ওয়ার্ড এবং প্রায় নব্বই হাজার গ্রাম আছে।

এসব স্থানীয় সরকার পরিষদে প্রায় লক্ষাধিক জনপ্রতিনিধি রয়েছেন। তাঁরা সরকারেরই অংশ। এ প্রতিনিধিগণের প্রায় সবাই অবস্থাপন্ন সচ্ছল কৃষক। প্রত্যেকের বাড়িতে পর্যাপ্ত জায়গা, ঘর ও সক্ষমতা রয়েছে, যে কোনো নতুন ধ্যান-ধারণা বহন ও গ্রহণের। প্রত্যেক গ্রামে এ রকম আরো অনেক কৃষক পাওয়া যাবে। সব মিলে কয়েক লক্ষ সক্ষম কৃষক বাছাই করা যাবে, যারা সরকারি ব্যবস্থাপনায় তাদের গোলায় ধান সংরক্ষণ কার্যক্রমে অংশ নিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করবে। যোগাযোগ ব্যবস্থা দেখে মানসম্পন্ন গোলাঘর নির্বাচন করতে হবে। গোলাঘর মেরামত, নির্মাণ ও সংরক্ষণে পরামর্শ ও ট্রেনিং দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে আর্থিক সহযোগিতা দিলে সংগৃহীত ধানের মূল্য হতে কেটে রাখা যেতে পারে। নির্বাচিত এ কৃষকগণের গোলায় ১০, ২০, ৩০,... টন করে ধান সংরক্ষণ করা হবে। এ ধান কৃষকের নিজের/ কয়েকজনের উত্পাদিত যৌথ ধান হবে। সহজ সংরক্ষণ প্রযুক্তিও উদ্ভাবন করতে হবে। চুক্তিবদ্ধ কৃষককে গোলায় মজুদকালে ধানের পূর্ব নির্ধারিত সরকারি/ধার্যকৃত ন্যায্য মূল্যের এক তৃতীয়াংশ বা অর্ধেক দাম এবং বাকী টাকা মানসম্মত সব ধান সরবরাহের সময় দেয়া যেতে পারে। ব্যাংকও এক্ষেত্রে ধান বন্ধক রেখে জিম্মাদার হয়ে টাকা দিতে পারে। স্থানীয় সরকার বা অন্য কোনো ব্যবস্থাপনা সব কিছু তদারকি করতে পারে। সরকারি গুদামে ধান সংরক্ষণে অনেক টাকা ব্যয় হয়। এ ক্ষেত্রে সংরক্ষণকারী কৃষককে সংরক্ষণের খরচ হিসাবে কিছু টাকা দিতে হবে। সংরক্ষণ ও নিরাপত্তার দায়িত্ব কৃষকের। নষ্ট বা কম মানসম্পন্ন ধান সরকার নেবে না বা ক্ষতিপূরণ দেয়া হবে না বা কৃষক প্রদত্ত টাকা ফেরত দিতে বাধ্য হবেন । দেশে বেশকিছু স্থানে বিএডিসি, কৃষি বিভাগসহ অন্যান্য সরকারি প্রতিষ্ঠানের পরিত্যক্ত গুদাম/গোডাউন রয়েছে। এগুলো মেরামত করে ব্যবহার করা যেতে পারে। স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার খালি ঘরেও রাখা যেতে পারে। সরকারি গোডাউনে আমদানিকৃত চাল না রেখে দেশে উত্পাদিত ধান রাখা যেতে পারে। বেসরকারি আমদানিকারিগণ নিজ দায়িত্বে আমদানিকৃত পণ্য সংরক্ষণ করবেন। চাল কলগুলোকে এ সংরক্ষণকৃত ধান কিনে ভাংগাতে বাধ্য থাকতে হবে। চাল কল স্থাপনে, পরিচালনায় সংরক্ষিত ধান কেনার বাধ্যকতা থাকতে হবে । বর্তমানে চাল নিয়ে ধান্ধাবাজি বন্ধ করতে হবে । ভারত হতে সস্তায় আমদানিকৃত চাল গোলায় সংরক্ষণ করা হচ্ছে, সরকার যখন চাল কিনবে তখন এ চাল উচ্চ মূল্যে সরকারি গুদামে সরবরাহ করা হবে। কোনভাবেই তা হতে দেয়া যাবে না। এতে কৃষককে সহায়তার সরকারি উদ্যোগ সম্পূর্ণ ভেস্তে যাবে। ‘দেশীয় চালকলে ভাংগা চাল’ যথাযথ কর্তৃপক্ষের এ রকম সার্টিফিকেট ছাড়া সরকারি কোনো গুদামে চাল কেনা যাবে না। যুক্তিসংগত দামে তাঁদের কাছ থেকে চাল কিনতে হবে। চাল কলগুলোকে বিভিন্ন রকম সহায়তাও দিতে হবে । হাওর এলাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পর্যাপ্ত পরিমাণে গুদাম ঘর/ খাদ্য শাইলো নির্মাণ করতে হবে।

শত বছরের বংশ পরম্পরায় অভিজ্ঞ কৃষক জানে, ধান কতটুকু ও কিভাবে শুকাতে এবং সংরক্ষণ করতে হবে। একটি ধান দাঁতে কেটে বা কানের কাছে নিয়ে শব্দ শুনেই শুকনার অবস্থা বুঝতে পারেন। আর একটু বুদ্ধি, পরামর্শ বা ট্রেনিং-এর মান বাড়িয়ে দেবে হাজার গুণ বেশি। কৃষকের গোলায় ধান মজুদের ফলে সরাসরি কৃষককে সরকার নির্ধারিত মূল্য নিশ্চিত করা এবং এলাকায় কাজের বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচীতে ব্যবহার করা যাবে। এলাকাভিত্তিক চাল কলও স্থাপন করতে হবে। ফলে খাদ্য পরিবহন ব্যয় ও অপচয় কমে যাবে। হাওর এলাকার বাহিরে ধান নিয়ে চাল বানিয়ে ফেরত আনার দ্বিমুখী ক্ষতি হতে রক্ষা পাবে। অনেক কর্মসংস্থান ও প্রাণচাঞ্চল্য আসবে। সরকার নির্ধারিত/ন্যায্য মূল্যে ধান কিনবেন, এ নিশ্চয়তা দিলে কৃষক যথাযথভাবে ধান সংরক্ষণ করবে, অধিক উত্পাদনে আগ্রহী হবে, প্রয়োজনে গুদাম ঘর তৈরি করে ধান রাখবে। দায়িত্ব দিলেই মানুষ দায়িত্ববান হয়। এভাবে লক্ষ লক্ষ মণ ধান কৃষকের গোলায় সংরক্ষণ করে মধ্যস্বত্যভোগীদের দৌরাত্ম্য কমিয়ে সরকার সহজেই বাজার নিয়ন্ত্রণ এবং জনগণকে সম্পৃক্ত করে সুষম উন্নয়ন নিশ্চিত করতে পারবে। এরূপে গড়ে উঠা একটি জনসম্পৃক্ত টেকসই সংস্কৃতি আমাদের কৃষির ভিতকে মজবুত করবে বলে আমার বিশ্বাস।