সোমবার, 22 জুন 2015 14:12

খাদ্যনিরাপত্তার সারথি

বণিক বার্তা ।। কয়েকটি তথ্যগত দিক আলোচনার মাধ্যমে লেখাটি শুরু করতে চাই। দেশের মোট জমিতে যেসব ফসল আবাদ হচ্ছে, তার সিংহভাগই এখন ধানের চাষ। মোট জমির ৮১ শতাংশে ফসলটি আবাদ হচ্ছে। অথচ দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আবাদকারী ফসলগুলোর মধ্যে রয়েছে পাট, গম, আলু, সবজি, তেলজাতীয়। এসব ফসল প্রতিটিতে ৩ শতাংশ করে আবাদ হচ্ছে। আর যেসব জমিতে ধান আবাদ হচ্ছে, তার সিংহভাগই আবার বাংলাদেশ ধান গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (ব্রি) উদ্ভাবিত জাত। দেশের অন্যতম শীর্ষ এ গবেষণা প্রতিষ্ঠানের উদ্ভাবিত জাতগুলোর মাধ্যমে ৮০ শতাংশ জমি আবাদ হচ্ছে। অর্থাত্ মোট আবাদি জমির ৬৫ শতাংশেই এখন ব্রি উদ্ভাবিত ধানের জাত আবাদ হচ্ছে।
প্রতিষ্ঠার পর থেকে আজ পর্যন্ত ব্রি চারটি হাইব্রিডসহ ৬৫টি ধানের উদ্ভাবন করেছে। প্রতিষ্ঠা হওয়ার পর থেকেই দেশে ধানের বিভিন্ন জাত উদ্ভাবনের মাধ্যমে চালের চাহিদা পূরণে রেখে চলেছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। দেশের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এ প্রতিষ্ঠানের চার দশকের অর্জনের পাল্লাটাও বেশ ভারী বলতে হবে। কেননা ব্রি উদ্ভাবিত ধান জাত সনাতন ধানের তুলনায় দুই থেকে-তিন গুণ বেশি ফলন দেয়। সেজন্যই বর্তমানে দেশের শতকরা প্রায় ৮০ ভাগ জমিতে ব্রি উদ্ভাবিত উচ্চফলনশীল ধানের চাষাবাদ করা হয়। এছাড়া দেশের মোট ধান উৎপাদনের শতকরা প্রায় ৯০ ভাগই ব্রি উদ্ভাবিত উচ্চফলনশীল ধানের জাত থেকে আসছে। ভাতের অভাব পূরণে ব্রি উদ্ভাবিত আধুনিক জাতগুলোর ভূমিকা এখানে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
তবে সম্প্রতি গ্লোবাল-ওয়ার্মিং নিয়ে অনেক কথা হচ্ছে। বিষয়টি আমাদের জন্য যে বেশ নাজুক, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। এ নিয়ে দেশী বিজ্ঞানীদের উদ্বিগ্নতার শেষ নেই। তারা গবেষণা করছেন। নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সহকারী অধ্যাপকের জলবায়ু পরিবর্তনের একটি উপাত্ত বিশ্লেষণ করেছি। তাদের গবেষণায় স্পষ্টতই দেখা যাচ্ছে, আমাদের তাপমাত্রা বাড়ছে। বৃষ্টিপাতের অবস্থাও তাই। অর্থাত্ তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাত দুই-ই বাড়ছে। তবে শীতে তাপমাত্রা সময়বিশেষে কিছুটা নেমে যাওয়ার প্রমাণ আছে। তাই বলা যায়, তাপমাত্রা কিছুটা চরমভাবাপন্ন হওয়ার পথে। অর্থাত্ শীতে বেশি শীত এবং গরমে বেশি গরম। এখানে বলা হয়েছে ধানের ফলন ২০৭০ নাগাদ প্রায় ৫০ শতাংশ কমে যেতে পারে। এর প্রধান কারণ হিসেবে বলা হয়েছে তাপমাত্রা বৃদ্ধি। এ গবেষণায় জনসংখ্যা বৃদ্ধির বিষয়টি নেই। আমার কাছেও ২০৭০ পর্যন্ত নির্দিষ্ট কোনো উপাত্ত নেই। তবে এ কথা বলা যায় যে, তখন বাংলাদেশের জনসংখ্যা ২৫ কোটির কম হবে না। অথচ ধানের ফলন কমে যাবে। পাশাপাশি আমাদের খাবারের মোট চাহিদা বেড়ে যাবে। তাই জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলা করে জাত উদ্ভাবনই বড় চ্যালেঞ্জ। প্রতিনিয়ত বিভিন্ন ঘাতসহিষ্ণু জাতের ধানের চাহিদা তৈরি হচ্ছে। এজন্য দ্রুত রেসপন্স করতে হচ্ছে। গবেষণায় জোর দেয়া হচ্ছে। তাপমাত্রা, খরা, বন্যা ও লবণাক্ততা মোকাবেলায় উন্নত জাতের প্রযুক্তি আনতে প্রতিনিয়তই গবেষণার কোনো বিকল্প নেই। আমরা ভাত খেয়ে বেঁচে থাকি। আমাদের জন্য ধানই সমৃদ্ধি। ধানের উৎপাদন বাড়াতে হবে। যেখানে আছে, সেখান থেকে কোনোক্রমেই ধানের ফলন কমতে দেয়া যাবে না। সেজন্য ধান নিয়ে গবেষণা জোরদার করতে হবে। গবেষণায় নতুন ধারার প্রবর্তন করতে হবে। সে কাজটিই করে যাচ্ছে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি)।
দেশের প্রায় ৪ দশমিক ৭৬ মিলিয়ন হেক্টর বোরোর জমি থেকে মোট চালের উৎপাদন আসে ১৮ দশমিক ৭৮ মিলিয়ন টন। বোরোর আবাদি আওতা মোট ধানি জমির ৪২ শতাংশ হলেও উৎপাদনের পরিমাণ ৫৬ শতাংশ। অন্যদিকে মোট আবাদি জমির ৪৯ শতাংশ আমন আবাদ হলেও ধান উৎপাদন হচ্ছে ৩৮ শতাংশ। বর্তমানে ৫ দশমিক ৬২ মিলিয়ন হেক্টর জমিতে উৎপাদনের পরিমাণ ১২ দশমিক ৯০ মিলিয়ন টন। এখানে আমনের অবদান তেমন উল্লেখযোগ্য নয়। যা-ই হোক, অতীতে পরিবেশবান্ধব আউশ ধানের একটা বিশেষ ভূমিকা থাকলেও আজ আর তেমন নেই। দেশে এখন মাত্র ১ মিলিয়ন হেক্টর জমিতে আউশ ধানের চাষ হয়ে থাকে। মোট ধানি জমির ৬ শতাংশ মাত্র। এ থেকে উৎপাদিত চালের পরিমাণ মোট উৎপাদিত চালের মাত্র ৯ শতাংশ। অথচ একসময় বোরো ছিল নিতান্তই সীমিত এলাকার জন্য। আউশ ছিল রোপা আমনের মতো গুরুত্বপূর্ণ ফসল।
এক দশক আগেও ব্রি যতগুলো জাত উদ্ভাবন করেছে, সেগুলো মোটামুটি দেশীয় চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে উৎপাদন বাড়ানোর জন্যই। বিশ্বের সবচেয়ে বেশি জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকিতে থাকা দেশটির চাল উৎপাদন বাড়াতে কার্যকর জাত উন্নয়নে পদক্ষেপ প্রয়োজন। পরিবর্তিত আবহাওয়ার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে ধানের নতুন নতুন জাত উদ্ভাবন করতে খরা, বন্যা ও লবণাক্ততা মোকাবেলায় উন্নত জাতের প্রযুক্তি আনছে প্রতিষ্ঠানটি।
আশার কথা হলো নতুন যেসব জাত আনছে, সেগুলো প্রতিকূল পরিবেশসহিষ্ণু। বৈরী অবস্থা মাথায় রেখে বেশকিছু ধানের জাত উদ্ভাবন করা হয়েছে। যেমন ব্রি ধান৫১ এবং ব্রি ধান৫২ কিছুটা ঘোলা পানির নিচে দুই সপ্তাহ ডুবে থাকলেও টিকে থাকতে পারে। ব্রি ধান৫৬ এবং ব্রি ধান৫৭ প্রজনন পর্যায়ের খরা কিছুটা হলেও হয় সহ্য করতে পারে অথবা পরিহার করতে পারে। রোপা আমন মৌসুমে উপকূলীয় এলাকার কোথাও কোথাও লবণাক্ততা সমস্যা হতে পারে। এজন্য ব্রি ধান৪০, ব্রি ধান৪১ প্রথমে ছাড় করা হয়। এগুলোর জীবনকাল কিছুটা বেশি হওয়ায় চাষীদের মধ্যে কিছুটা আগ্রহের কমতি ছিল। পরে স্বল্প জীবনকালীন দুটি জাত ব্রি ধান৫৩ এবং ব্রি ধান৫৪ দুটি জাত চাষীদের দেয়া হয়। জাত দুটো ভালো করছে।
আমন ও বোরোর জন্য ভালো কিছু করা গেলেও আউশ মৌসুমের জন্য স্বীকৃত কিছু করা যায়নি। বৃষ্টিনির্ভর বোনা আউশের কয়েকটি ভালো জাত আমাদের হাতে আছে। যেমন ব্রি২১, ব্রি২৪, ব্রি৪২ ও ব্রি৪৩। তবে আউশ বলতে যা বোঝায়, এ জাতগুলোকে সেভাবে বিশেষায়িত করা ঠিক না। তবুও জাতগুলো মোটামুটি খরাসহনশীল। শুধু রোপা আউশ হিসেবে উদ্ভাবিত জাতগুলো হলো বিআর২৬, ব্রি ধান২৭ ও ব্রি৪৮। আউশ পরিবেশবান্ধব ফসল। বৃষ্টিনির্ভর বলে এবং বোনা আউশে সেচের দরকার হয় না বলে পানি সংরক্ষণে আউশ ধান একটি বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু আবহাওয়াগত কারণে আউশ কিছুটা কম ফলন দেয় তাই এর প্রতি সুবিচার করা হয়নি। সংশ্লিষ্ট মহলের দূরদর্শিতার অভাবও আছে বলা যায়। তাই আউশের গবেষণা খুব একটা এগোতে পারেনি।
সেচনির্ভর বোরো ধান উদ্ভাবনের অগ্রগতি উল্লেখযোগ্য। একসময় বোরোর জাত উদ্ভাবন করা হতো শুধু অনুকূল পরিবেশের কথা মাথায় রেখে। ফলে বোরো নিজেই কিছুটা মাথাব্যথার কারণ হয়ে গেছে। তবে বৈরী পরিবেশে বোরোর জাত উদ্ভাবনের কাজ পিছিয়ে নেই। দেশের উপকূলীয় এলাকার জন্য লবণসহনশীল বেশ কয়েকটি জাত উদ্ভাবন করা হয়েছে। ব্রি ধান৪৭ ও ব্রি ধান৬১ মোটামুটি লবণসহনশীল। রোপা আমনের ব্যাপারে অগ্রগতি কম হয়েছে বলা যাবে না। তবে মৌসুমের কারণে ফলন বোরো থেকে কিছুটা কম। তাই বোরোর তুলনায় আবাদি এলাকা কিছুটা বেশি হওয়া সত্ত্বেও মোট উৎপাদন কিছুটা কম।
ফলে সেচনির্ভর আবাদ কার্যক্রমের কারণে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে। ফলে কৃষিকাজ এবং ধান উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় পানির অভাব দেখা দিচ্ছে। এজন্য এখনই বোরোর আবাদি এলাকা কমিয়ে ফেলা দরকার। গ্লোবাল ওয়ার্মিংয়ের কারণে দেশের প্রায় ১৮ শতাংশ জমি পানির নিচে ডুবে যেতে পারে। সাগর থেকে লোনা পানি ভেতরে বহু দূর পর্যন্ত অনুপ্রবেশ করবে। এজন্য যা করা দরকার তা হলো, বোরো ধানের চারা এবং প্রজনন পর্যায়ে ঠাণ্ডা সহনশীল করার জন্য গবেষণা জোরদার করা। পরিবেশবান্ধব আউশ ধানের আবাদ বাড়ানোর তাগিদে খরাপ্রতিরোধী এবং প্রজনন পর্যায়ে উচ্চ তাপমাত্রা সহনশীল জাত উদ্ভাবনে কাজ করা হচ্ছে।
ব্রি এখন সেচনির্ভর থেকে বৃষ্টিনির্ভর বা পানিসাশ্রয়ী প্রযুক্তির উদ্ভাবনের চিন্তা করছে। এজন্য চার দশক ধরে বোরোর কাছে আউশের হারানো জমি কীভাবে উদ্ধার করা যায়, কত দিনে কতখানি উদ্ধার করা যায় এবং কতখানি উদ্ধার করলে আমাদের খাদ্য উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হবে না, তা নিয়ে কিছু চিন্তা-ভাবনা এরই মধ্যে করা হয়েছে। ব্রির হিসাব অনুযায়ী, খাদ্য উৎপাদন ঠিক রেখে বোরো চাষের ২০ শতাংশ (প্রায় দশমিক ৯ মিলিয়ন টন হেক্টর) জমি আউশ আবাদে ফিরিয়ে দেয়া সম্ভব। এ কারণে আউশের বিদ্যমান আবাদি এলাকাসহ মোট ১ দশমিক ৮ মিলিয়ন হেক্টর জমিতে আউশ আবাদ করতে হবে। এজন্য আউশ থেকে ধানের মোট উৎপাদন আসতে হবে ৭ দশমিক ৩ মিলিয়ন টন এবং আউশের ফলন হতে হবে ধানের হিসাবে হেক্টরপ্রতি ৪ টন। বিজ্ঞানীদের প্রাথমিক সিমুলেশন ফলাফল অনুযায়ী, আউশ মৌসুমে প্রস্তাবিত ধানের ফলন বাস্তবায়ন করা সম্ভব হলে দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা মিটিয়ে প্রয়োজনীয় মজুদ রেখে ২০৩০ সাল নাগাদ প্রায় ১ দশমিক ৬ মিলিয়ন টন চাল (চালকে ১ দশমিক ৪২ দিয়ে গুণ করলে ধানের হিসাব পাওয়া যায়) বিশ্ববাজারে রফতানি করা যাবে। আর এ ফলন নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজন নির্দিষ্ট এলাকার জন্য বিশেষভাবে উপযোগী উচ্চফলনশীল (উফশী) জাত, ধান উৎপাদন কৌশলের উপযুক্ত সমন্বয় এবং সর্বোপরি সময় বুঝে সাশ্রয়ী ও সম্পূরক সেচের ব্যবস্থা নিশ্চিতকরণ। এছাড়া সমগ্র বাংলাদেশে অন্যান্য জমিসহ চাষযোগ্য পতিত জমি আবাদের আওতায় এনে প্রায় ৪ মিলিয়ন হেক্টর জমি আউশ ধানের আওতায় আনা যায়। উফশী ও হাইব্রিড দ্বারা স্থানীয় জাত প্রতিস্থাপন করেও আউশ ও আমনের উৎপাদন বাড়ানো যায়। আউশ ও আমন মৌসুমে বিদ্যমান ঝুঁকিগুলোর মধ্যে খরা, আগাম বন্যা, অতিবৃষ্টি, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, বীজের সুপ্ততা, লবণাক্ততা, আগাছা, রোগবালাই, পোকামাকড় ইত্যাদি সমস্যা উল্লেখযোগ্য। সময়মতো আউশ ধান লাগানো এবং নির্বিঘ্নে ফসল কাটার জন্য উন্নত কৃষি যন্ত্রপাতির ব্যবহারও খুব গুরত্বপূর্ণ।
তবে ব্রি শুধু ধানের জাত উন্নয়নে সীমাবদ্ধ থেকেছে ব্যাপারটি তা নয়। জাত সম্প্রসারণ এবং উচ্চমাত্রায় ফলন পেতে বিভিন্ন সময়ে প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন এবং তা কৃষক পর্যায়ে সম্প্রসারণ করা হয়েছে। ব্রি এ পর্যন্ত ২৫টি উন্নত কৃষিযন্ত্র উদ্ভাবন করেছে, যা এ দেশে বিভিন্নভাবে ধান চাষাবাদের কাজকে সহজ, সাশ্রয়ী ও লাভজনক করার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখছে। বোরোর জন্য পানিসাশ্রয়ী জাত বা আবাদ প্রযুক্তি উদ্ভাবন বা পরিমার্জনের কাজ চলছে। এরই মধ্যে এডব্লিউডি সেচ প্রযুক্তির প্রতি চাষীদের আগ্রহ বাড়ছে। সম্প্রতি ‘খামার যন্ত্রপাতি ও ফলনোত্তর প্রযুক্তি বিভাগে’র বিজ্ঞানীরা দুটি নতুন যন্ত্র উদ্ভাবন ও উন্নয়নের কাজ সম্পন্ন করেছেন। এর একটি হলো, গুটি ইউরিয়া প্রয়োগযন্ত্র বা ইউএসজি অ্যাপ্লিকেটর এবং অন্যটি রাইস ট্রান্সপ্লান্টার বা ধান রোপণ যন্ত্র। প্রথম যন্ত্রটি ব্যবহার করে ধানের জমিতে হাতে গুটি ইউরিয়া প্রয়োগের তুলনায় প্রতি হেক্টরে ১ হাজার ৪০০ টাকা সাশ্রয় করা সম্ভব। একইভাবে কোরিয়া থেকে আমদানিকৃত এবং স্থানীয়ভাবে ব্যবহার উপযোগী রাইস ট্রান্সপ্লান্টার যন্ত্রটি ব্যবহার করে চারা উৎপাদনের ক্ষেত্রে কিছুটা বাড়তি খরচ সত্ত্বেও হাতে ধান রোপণের প্রচলিত কষ্টকর পদ্ধতির তুলনায়
প্রতি হেক্টরে প্রায় ৩ হাজার ৭২৭ টাকা সাশ্রয় করা যায়। সব মিলিয়ে ব্রি উদ্ভাবিত ও উন্নয়নকৃত গুটি ইউরিয়া প্রয়োগ এবং ধানের চারা রোপণের যন্ত্র ব্যবহারে ধান উৎপাদন খরচ প্রতি হেক্টরে ৫ হাজার টাকা কমিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে।
তবে প্রতিষ্ঠানটির সামনের দিনে আরো চ্যালেঞ্জ রয়েছে। কেননা লাগসই ধানের জাত উদ্ভাবনের পাশাপাশি ইকোসিস্টেম ও শস্য বিন্যাসভিত্তিক উৎপাদন ব্যবস্থার উন্নয়ন করতে হবে। এছাড়া বোরো মৌসুমে শুকনো জমিতে সরাসরি ধান বপনের জন্য উপযুক্ত ধানের জাত উন্নয়ন, দক্ষিণাঞ্চলের লবণাক্ত ও অলবণাক্ত জোয়ার-ভাটায় প্লাবিত পরিবেশের উপযোগী আউশ ও আমন মৌসুমের ধানের জাত উদ্ভাবন করা। এছাড়া দক্ষিণাঞ্চলের কিছু স্থানীয় ধানের জাত যেমন আউশ মৌসুমে মালা এবং আমন মৌসুমের সাদা মোটা ধানের জাতগুলো থেকে বিশুদ্ধ সারি নির্বাচন পদ্ধতি প্রয়োগের মাধ্যমে উন্নয়ন ঘটানো। এছাড়া ভবিষ্যতে ধানের জাত উন্নয়নের ক্ষেত্রে জলাবদ্ধতা ও গভীর পানিসহিষ্ণু (১ মিটার গভীরতা পর্যন্ত) উফশী ধানের জাতের উদ্ভাবন সঠিক নীতিনির্ধারণের জন্য ক্রপ-মডেলিংকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে জোরদার করছে প্রতিষ্ঠানটি।
জলবায়ুর পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে যথাযথ জোয়ার-ভাটাসহনশীল জাত বের করার ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। বন্যা বা বৃষ্টিতে জলমগ্ন হওয়া বা অবিরত জলাবদ্ধ পরিবেশের জন্য রোপা আমন ধানের জাত উন্নয়নে কার্যকর ভূমিকা রাখা। খরাসহনশীল রোপা আমনের জাত উদ্ভাবনের কাজ জোরদার করা। লবণাক্ত এলাকার জন্য আরো ভালো লবণসহনশীল জাত উদ্ভাবনে কাজ করা। স্বল্পমেয়াদি এবং উচ্চফলনশীল জাত উদ্ভাবনে বিশেষ কার্যক্রম হাতে নেয়া। বায়োলজিক্যালি নাইট্রোজেন ফিক্স করতে পারে এমন জাত বের করার জন্য কাজ করা। পরিবেশবান্ধব এবং অধিকতর বৈরী পরিবেশসহনশীল ট্রানজেনিক ধানের জাত বের করার চেষ্টা করা হচ্ছে।

জীবন কৃষ্ণ বিশ্বাস, মহাপরিচালক, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট, গাজীপুর