রবিবার, 20 অগাস্ট 2017 11:06

‘বানের পানিত পচি গেইচে ধান’

রংপুরের তারাগঞ্জের জগদীশপুর গ্রামের রুস্তম আলী বন্যার পানিতে পচে যাওয়া আমন ধানের চারা তুলে দেখছেন। ছবিটি গতকাল ভেড়ভেড়ির মাঠ থেকে তোলা রংপুরের তারাগঞ্জের জগদীশপুর গ্রামের রুস্তম আলী বন্যার পানিতে পচে যাওয়া আমন ধানের চারা তুলে দেখছেন। ছবিটি গতকাল ভেড়ভেড়ির মাঠ থেকে তোলা

প্রথম আলো || বসতবাড়ির ২০০ গজ দূরে সেকেন্দার আলীর (৬৫) এক একর ২১ শতক আমন ধানের জমি। এখনো সেখানে পানি। ১০ দিন আগে টানা বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা ঢলে সৃষ্ট বন্যার পানি ঢুকে অন্য কৃষকের মতো তাঁর জমিও প্লাবিত হয়েছিল। বাড়িতেও বুকপানি ওঠে। এ অবস্থায় স্ত্রী ও তিন সন্তান নিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন অন্য গ্রামে আত্মীয়ের বাড়ি।

সেকেন্দারের বাড়ি রংপুরের তারাগঞ্জের মধুরামপুরে। গতকাল শনিবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে সেকেন্দার পানিতে ডুবে যাওয়া তাঁর জমি ও বাড়িটি একনজর দেখতে আসেন। জমিতে তখনো অল্পবিস্তর পানি। রোপণ করা আমনের চারা পচে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। হাত দিয়ে তিনি কিছু চারা ধরতেই গোড়াসহ উপড়ে আসে। কান্নাজড়িত কণ্ঠে সেকেন্দার বলেন, ‘মোর সউগ শ্যাষ, কিছু নাই। বোরো ধান পোকায় খাইছে, আলুগারছুনুং তা লস হইছে। বানের পানিত পচি গেইচে আমন ধান। কম দামে গরু-ছাগল বেচপার নাগেছে। ফের ধান গাইরবার চাউছুং, তা চারা পাইচুং না। মোক এবার না খেয়া মরিবার নাগবে মনে হয় বাহে।’

সেকেন্দারের জমির পাশে আলে বসে থাকা কোমরপাড়া গ্রামের আজগার আলীর (৬০) চোখের কোণেও পানি। তিনিও বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। সেকেন্দারের জমির পাশে তাঁরও দেড় একর জমির ধান পচে গেছে। আল থেকে জমিতে নেমে পচে যাওয়া ধানের চারা তুলে দেখাচ্ছিলেন আর কাঁদছিলেন আজগার আলী। এ সময় দুটি জোঁক তাঁর ডান পায়ে কামড়ে ধরে। জোঁক দুটি টেনে ছুড়ে ফেলতে ফেলতে আজগার আলী বিলাপ করে বলতে থাকেন, ‘জোঁকের কামড় না হয় সহ্য করলাম। কিন্তু বন্যার কামড় সহ্য করমো কেমন করি? ঈদে-বা করমো কী দিয়া? ছাওয়া-পোয়াক-বা খাওয়ামো কী?’

গতকাল তারাগঞ্জ উপজেলার মধুরামপুর, ভেড়ভেড়ি, দোলাপাড়া, শেখপাড়া, মংলাডুবের, চিকলী, উজিয়াল, বালাপাড়া, কাচাঁনা, দোয়ালীপাড়া মাঠসহ ১৫টি মাঠ ঘুরে সেকেন্দার ও আজগারের মতো আরও কয়েকটি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্যের সঙ্গে কথা হয়। তাঁদের এককথা, বন্যার পানিতে তাঁদের ফসলি জমিসহ বসতভিটা প্লাবিত হওয়ায় ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। নলকূপ পানিতে ডুবে নষ্ট হওয়ায় খাওয়ার পানিরও তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। পরিবার-পরিজন নিয়ে কষ্টে আছেন তাঁরা। সংসারের দৈনন্দিন নানা প্রয়োজন মেটাতে কম দামে গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগি বিক্রি করতে শুরু করেছেন।

জগদীশপুর গ্রামের শাহাজাদা মিয়া (৩৫) বলেন, ‘মোর ঘরদুয়ার বানের পানিত ডুবি নষ্ট হইচে। ৫০ শতক জমির আমন ধানও পচি গেইচে। হাতোত টাকা নাই, গরু-বাছুরেরও খাবার নাই। শুক্রবার একটা খাসি বকরি বেচার জন্যি তারাগঞ্জে হাটোত নিগাছুন। সারা দিন বসি থাকি সন্ধ্যার সময় ৬ হাজার টাকার খাসিটা ৫ হাজার টাকাত বেচাছুন।’ ওই গ্রামেরই আরেক কৃষক রুস্তম আলী (৬৫) বলেন, ‘ভালো করি নেখি (লিখে) নেন। হামরা ইলিপ চাই না, ধানের বীজ দেন। তা না হইলে হামার সমস্যা হইবে। নিজে খামো কী, ছাওয়াগুলাকে খিলামো কী?’

দোয়ালীপাড়া গ্রামের চারদিকে এখনো বন্যার পানি থইথই করছে। গ্রামটির দেড় শতাধিক পরিবারের অনেকেই ফাজিলপুর উচ্চবিদ্যালয়ে আশ্রয় নিয়েছে। কেউ নিজের ঘরেই কোনো রকমে একটা ব্যবস্থা করে থাকছেন। পানি আরও বাড়লে কী করবেন, কোথায় যাবেন, ভেবে পাচ্ছেন না গ্রামটির মানুষ। ওই গ্রামের গৃহবধূ মিনারা খাতুন (৩৮) বলেন, ‘পানি যত না কমছে, হামার কষ্ট ততো নায় বাড়োছে। ঘরোত খাবার নাই, চিকিৎসা কইরার পাইসা (টাকা) নাই। ছাওয়াগুলারও জ্বর। পায়খানা, টিউবওয়েল ভাঙি গেইছে। হামার পেকে কায়ও তাকাওছে না, কত্ত দুঃখে আছি দেখেছে না। ইলিপও দেওছে না।’

তারাগঞ্জে গ্রামের পর গ্রাম এখন বন্যার পানিতে লন্ডভন্ড হয়ে আছে। যেন বিধ্বস্ত এক জনপদ। যে জনপদে কৃষকের ঘরে খাবার নেই, জমিতে ধান নেই। রাস্তাঘাট ভেঙে গেছে। এমনই এক ভাঙা মেঠো সড়ক ধরে ভ্যানে করে যাওয়ার সময় কথা হয় যমুনেশ্বরী নদীর তীরে হাড়িয়ারকুঠি ইউনিয়নের যুগীপাড়া গ্রামের গৃহবধূ শিল্পী রানীর সঙ্গে (৩২)। তিনি বলেন, ‘মোর স্বামী, শ্বশুর অসুস্থ। ঘরোত খাবার নাই। হাতোত টাকা নাই। বাপের বাড়ি থাকি দুই কেজি চাউল আর এক কেজি আটা নিয়া আনু। সয়ার ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মহিউদ্দিন আজম বলেন, ‘কৃষকদের অবস্থা খুব করুণ। তাঁদের আদা, মরিচ, বেগুন, শাক, ধান—সবই শেষ। মাছ ভাসি গেইছে। হাহাকার করছেন তাঁরা। কিন্তু এখনো তাঁদের সাহায্য করতে কেউ আসেনি।’তারাগঞ্জ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আনিছুর রহমান বলেন, তারাগঞ্জে বন্যায় ৫ ইউনিয়নের ৪০টি গ্রামের ১০ হাজার পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সবচেয়ে দুরবস্থায় পড়েছেন কৃষকেরা। অথচ দুই দফায় তাঁদের জন্য সরকারিভাবে মাত্র ১৫ টন চাল বরাদ্দ পাওয়া গেছে। প্রয়োজনের তুলনায় বরাদ্দ কম হওয়ায় সবাইকে এ চাল দেওয়া সম্ভব হয়নি।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রেজাউল করিম বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকেরা যাতে ঘুরে দাঁড়াতে পারেন, সে জন্য কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে নানা রকম পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। ইউএনও জিলুফা সুলতানা বলেন, বন্যার্তদের জন্য আরও বরাদ্দ আনার চেষ্টা করা হচ্ছে।