বুধবার, 16 অগাস্ট 2017 11:35

খাসিয়া পানে ‘উত্রাম’ রোগের প্রাদুর্ভাব, ক্ষতির মুখে চাষিরা

প্রথম আলো || মৌলভীবাজারে খাসিয়াপুঞ্জিগুলোর পানের বাগান ‘উত্রাম’ রোগের কবলে পড়েছে। পাতা পচা এই রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। অনেক বাগানের অর্ধেকের বেশি পানগাছই কেটে ফেলতে হচ্ছে। ফলে খাসিয়া পানচাষিরা মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। মৌলভীবাজারের বিভিন্ন পাহাড়ে রয়েছে ক্ষুদ্র জাতিসত্তার খাসিয়া সম্প্রদায়ের বাস। তারা পাহাড়ের বিভিন্ন পুঞ্জিতে (খাসিয়া গ্রাম) বাস করে এবং পুঞ্জিতেই খাসিয়া পানজুম বা পানের বাগান গড়ে তোলে। যুগ যুগ ধরে চলে আসা এই পান চাষই তাদের জীবিকা নির্বাহের অন্যতম উৎস।

কুলাউড়া উপজেলার কর্মধা ইউনিয়নের মেঘাটিলাপুঞ্জির সহকারী প্রধান ও পানচাষি সুরজিত লমুরং ১২ আগস্ট প্রথম আলোকে বলেন, এবার বাতাস বেশি হওয়ায় উত্রাম প্রখরভাবে দেখা দিয়েছে। দেখা যাচ্ছে, একটি পানবাগানে দেড় হাজারের মতো গাছ আছে। উত্রামের কারণে সেই বাগান থেকে ৭০০ থেকে ১ হাজার গাছই কেটে ফেলতে হচ্ছে। ফলে খাসিয়ারা আগামী বছর ভাত পাবে কি না, সন্দেহ। এই কর্মধা ইউনিয়নের লংলা পাহাড় এলাকাতেই ২৭-২৮টি খাসিয়াপুঞ্জি আছে। এ এলাকার মুরইছড়া, কুকিজুরি, লুতিজুরি, বালাইমা, আমুলি, চলতা, মোকামবাড়ি, নার্সারিসহ বিভিন্ন পুঞ্জির পানজুমে ‘উত্রাম’ ছড়িয়ে পড়েছে। সব মিলিয়ে মৌলভীবাজারে ৪৫টি খাসিয়াপুঞ্জি রয়েছে। এসব গ্রামে প্রায় ৩০ হাজার খাসিয়ার পাশাপাশি কিছু গারো সম্প্রদায়ের লোকজনের বাস।

খাসিয়াপুঞ্জির মন্ত্রী (পুঞ্জিপ্রধান) ও পানচাষিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, খাসিয়া গ্রামগুলোর পানজুমে ‘উত্রাম’ রোগ এবারই নতুন নয়। তবে অন্যান্যবারের তুলনায় এবার এর প্রাদুর্ভাব অনেক বেশি। এ রোগে পানপাতা পচে যায়। এ বছর বাতাস বেশি হওয়ায় এক পানজুম থেকে আরেকটিতে দ্রুত রোগটি ছড়িয়ে পড়ছে। এতে পানের গাছ কেটে ফেলতে হচ্ছে। খাসি সোশ্যাল কাউন্সিলের তথ্য কর্মকর্তা সাজু মারচিয়াং ১৩ আগস্ট প্রথম আলোকে বলেন, বর্ষায় পানগাছ থেকে চারা কলম করা হয়। কিন্তু রোগ থাকায় এখন আক্রান্ত গাছ থেকে চারা কলম করা যাচ্ছে না। কলম করা হলে তা আরও দ্রুত ছড়িয়ে পড়বে। আবার কলম না করার কারণে পানগাছে নতুন পাতা গজাতে পারছে না। এতে উৎপাদন কমে যাচ্ছে। অন্যদিকে চারা না হওয়ায় যেসব জায়গা খালি হয়েছে, সেখানে নতুন করে পানবাগান করা যাচ্ছে না।

রোগ প্রতিরোধের তৎপরতা নেই

পানচাষিরা বলছেন, ‘উত্রাম’ আক্রমণ করলে পানপাতা প্রথমে কালচে তেলতেলে রং ধারণ করে। পরে পাতাটি হলুদ হতে থাকে। তারপর পচে যায়। সঙ্গে সঙ্গে আক্রান্ত পাতাটি গাছ থেকে ছিঁড়ে নিয়ে মাটিতে পুঁতে ফেলতে হয়। ঐতিহ্যগতভাবে এক-দুই দিন পরপর বাগান ঘুরে দেখে আক্রান্ত পাতা খুঁজতে হয়। কিন্তু কোনো কারণে সাত-আট দিন পানবাগানে যেতে না পারলে এই রোগ মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়ে। কারণ, সে ক্ষেত্রে একটি থেকে আরেকটি, এভাবে পুরো পানবাগানই উত্রামে আক্রান্ত হয়। তখন সব গাছ কেটে ফেলা ছাড়া আর বিকল্প থাকে না। পানচাষিদের অভিযোগ, মৌলভীবাজারে ‘উত্রাম’ এখন ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়লেও তা প্রতিরোধে সরকারি কোনো তৎপরতা নেই। এতে খাসিয়া পান উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছেন চাষিরা।

বৃহত্তর সিলেট আদিবাসী ফোরামের মহাসচিব এবং লাউয়াছড়া পানপুঞ্জির মন্ত্রী পিলা পতমী ১৩ আগস্ট প্রথম আলোকে বলেন, ‘কমবেশি জেলার সব পুঞ্জিতেই এই রোগ আছে। এবার অনেক বেশি। বিভিন্ন সময় কৃষিবিদদের সঙ্গে আলাপ হয়েছে। কোনো সমাধান পাওয়া যায়নি। প্রথাগতভাবে আমরা যেটা করি, আক্রান্ত পাতা নিয়ে মাটিতে পুঁতে ফেলি। তারপর গরম পানিতে নিজেরা গোসল করি। আমাদের বিশ্বাস, এগুলো করলে নিজেদের মাধ্যমে রোগটি ছড়ায় না।’

 

মৌলভীবাজারে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের জেলা বীজ প্রত্যয়ন কর্মকর্তা কাজী লুৎফুল বারী প্রথম আলোকে বলেন, ‘সাধারণত বাংলা পানে পাতা পচা রোগ হয়ে থাকে। খাসিয়া পানে হওয়ার কথা নয়। তবু পাতা পচা রোগ হলে ছত্রাকনাশক ব্যবহারে এটি কমে যাওয়ার কথা। তবে ভাইরাস হলে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। এ বিষয়টি আমাদের কেউ জানায়নি। আমি লোক পাঠিয়ে খোঁজ নেব। অথবা তাঁরাও (খাসিয়ারা) যদি আক্রান্ত পাতা নিয়ে আসে, তাহলে রোগের ব্যাপারে নিশ্চিত হয়ে পরামর্শ দেওয়া যাবে।’