রবিবার, 19 নভেম্বর 2017 12:00

বাদাম আর শিম চাষ বদলে দিচ্ছে দুর্গম ফারুয়ার চিত্র

মানবকন্ঠ || রাঙ্গামাটি জেলার বিলাইছড়ি উপজেলার ফারুয়া ইউনিয়ন। সংরক্ষিত বনাঞ্চলের মধ্যে এ ইউনিয়নের মানুষ যুগ যুগ ধরে বঞ্চিত। অন্যদিকে সংরক্ষিত বনের বাসিন্দা হওয়ায় সরকারি সুবিধা এ ইউনিয়নে ঠিকমতো পৌঁছায় না। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, স্যানিটেশন, যোগাযোগ, অবকাঠামো থেকে এখনো বঞ্চিত ইউনিয়নের মানুষ। এ ইউনিয়নটি গত ১৩ জুন পাহাড় বেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এরপর একাধিকবার বন্যায় সবকিছু ধুয়ে-মুছে নিয়ে যায়। সরকারি ত্রাণ পাননি অভিযোগ আছে ইউনিয়নবাসীর। পাহাড়ধস আর বন্যার কারণে জমিতে বালুর স্তর জমে যাওয়ায় চাষ অযোগ্য হয়ে পড়ে জমিগুলো। ক্ষতিগ্রস্ত এসব পরিবার আবার জমিগুলোতে বাদাম ও শিম চাষের মধ্য দিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে।

সম্প্রতি ফারুয়ায় গিয়ে দেখা যায়, রেইংখ্যং নদীর পাড়ের চাইন্দ্যা পাড়া, উলুছড়ি, তক্তানালা, ওরাছড়ি, ইগুজ্জেছড়ি, গোয়াইনছড়ি, তারাছড়িসহ অনেক এলাকায় বাদাম চাষ করা হচ্ছে। এর সাথী ফসল হিসেবে দেয়া হয়েছে শিম। দেখা যায় কেউ জমি চাষযোগ্য করছেন। কেউ বীজ বপন করছেন। কেউ বাদাম ক্ষেতের আগাছা তুলে ফেলছেন। কেউ শিম লতার জন্য মাচা তৈরিতে প্রস্তুতি নিচ্ছেন। ওরাছড়ি গ্রামের মধুরানী তঞ্চঙ্গ্যা বলেন, গত পাহাড়ধস ও বন্যার কারণে তাদের এলাকায় সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ সরকার থেকে কোনো সহযোগিতা দেয়া হয়নি। একটি এনজিও তাদের ১২ হাজার ২৭৬ টাকা অফেরতযোগ্য সহায়তা দেয়ায় তারা আবার চাষাবাদে নামেন। তার বাদাম ক্ষেত ভালো হয়েছে। বাদাম ও শিম বিক্রি করে তিনি এ বছর ৮০-৯০ হাজার টাকা পাবেন বলে আশা করেন।

ওরাছড়ি গ্রামের গ্রাম প্রধান স্নেহ কুমার তঞ্চঙ্গ্যা বলেন, একের পর এক প্রাকৃতিক দুর্যোগে পথে বসার উপক্রম হয় আমাদের। এনজিও সিআইপিডির দেয়া ১২ হাজার ২৭৬ টাকা আমাদের খুব উপকারে এসেছে। এই ধরনের সহযোগিতা অতীতে কোনো সংস্থার কাছ থেকে কোনোবার পাওয়া যায়নি। তার গ্রামের ৫৩ পরিবার সবাই এ সহযোগিতা পেয়েছে।

তক্তানালা গ্রামের ভরত চন্দ্র তঞ্চঙ্গ্যা বলেন, ধান্য জমিতে বালুর স্তর জমে যাওয়ায় সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ জমিতে এখন তারা বাদাম চাষ করছেন। এতে সাথী ফসল হিসেবে চাষ করছেন শিম। বাদাম উত্তোলন হলে শিমের বীজ সংগ্রহ করা হবে। পরিবহন ব্যবস্থা দুর্গম হওয়ায় তারা পাকা শিমের বীজ বিক্রি করেন। বাদাম বিক্রি করেন মণপ্রতি ৪-৫ হাজার টাকা। শিমের বীজের দামও একই।

বেসরসকারি উন্নয়ন সংস্থা সিআইপিডির (সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড প্রোগ্রাম অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট) নির্বাহী পরিচালক জনলাল তঞ্চঙ্গ্যা বলেন, গত ১৩ জুন পাহাড়ধস ও বন্যার পর জুলাই মাসে ১৯টি গ্রামের ৫৯০ পরিবারের প্রত্যেক পরিবারকে ১২ হাজার ২৭৬ টাকা অফেরতযোগ্য সহায়তা প্রদান করা হয়। আওতাভুক্ত গ্রামের তঞ্চঙ্গ্যা, বাঙালি, মারমা সবাইকে এ সহযোগিতা দেয়া হয়। কাউকে বাদ দেয়া হয়নি। টাকার পরিমাণ কম হলেও সুবিধাভোগীরা টাকাগুলো যথাযথ ব্যবহার করেছেন।

সুবিধাভোগী ওরাছড়ি গ্রামের মীমাচিং মারমা বলেন, তারা পাওয়া টাকা থেকে তিনি দুটি শূকর কিনেছেন। অবশিষ্ট টাকা দিয়ে জুম চাষ করেছেন। সম্প্রতি শূকর দুটি মোট ১৫টি বাচ্চা দিয়েছে। প্রতিটি বিক্রি করছেন আড়াই হাজার টাকা করে। ফারুয়া হেডম্যান উজ্জ্বল তঞ্চঙ্গ্যা বলেন, দুর্যোগের পর সামান্য সিআইপিডির সহযোগিতা পেয়ে এলাকার মানুষ ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ পেয়েছেন।

বিলাইছড়ি উপজেলা চেয়ারম্যান শুভ মঙ্গল চাকমা বলেন বিলাইছড়িতে আগে তামাক চাষ হত। পাহাড় ধসের পরবর্তী সিআইপিডি ফারুয়ায় যে সহায়তা দিয়েছে তা আমি সরেজমিন গিয়ে দেখেছি। দুর্যোগের পর সামান্য টাকা পেয়ে তারা ঘুরে দাঁড়িয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম এলাকায় এ ধরণের সহায়তা অব্যাহত রাখা দরকার।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ পরিচালক পবন কুমার চাকমা বলেন, রাঙামাটিতে যে বাদাম উৎপাদিত হয় তার অধিকাংশ ফারুয়ায়। এ বছর ফারুয়া ইউনিয়নে ৫০ হেক্টর জমিতে বাদাম এবং ৬৮ হেক্টর জমিতে সীমের চাষ হয়েছে। এ বাদামের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্র ধরা হয়েছে ১২০ মেট্রিক টন, সীমের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৪৬৫ মেট্রিক টন। এ চাষে চাষিরা যেন লাভবান হতে পারে সেজন্য কৃষি বিভাগ নিয়মিত কৃষকদের কৃষি পরামর্শ দেয়া হচ্ছে।