রবিবার, 18 অক্টোবর 2015 17:20

এসি ল্যান্ডের ‘মাটির মায়া’

শাহাদত হোসেন, সহকারী কমিশনার, ভূমি l ছবি: প্রথম আলো শাহাদত হোসেন, সহকারী কমিশনার, ভূমি l ছবি: প্রথম আলো

প্রথম আলো || পরিপাটি কার্যালয়। তার এক পাশে রঙ্গন, গোলাপ, করবী, বকুল, কৃষ্ণচূড়া, বাগানবিলাসসহ বিভিন্ন ফুলের গাছ। প্রধান ফটকের ডান দিকে একটি টিনশেড ঘর, নাম ‘মাটির মায়া’। তাতে টেবিল নিয়ে বসে আছেন সহকারী কমিশনার, ভূমি (এসি ল্যান্ড) শাহাদত হোসেন। তাঁর পেছনে লেখা ‘আপনার এসি ল্যান্ড’। তাঁর সামনে দুই সারিতে টোকেন হাতে বসে আছেন সেবাপ্রার্থীরা। তিনি টোকেন নম্বর ধরে ডাকছেন, কথা বলছেন। দেখে মনে হবে, চিকিৎসক চেম্বারে রোগী দেখছেন, ব্যবস্থাপত্র দিচ্ছেন। এই চিত্রটি রাজশাহীর পবা উপজেলার ভূমি কার্যালয়ের। কার্যালয়ের বাইরে দালালের দৌরাত্ম্য। কাজ মানেই টাকা, বাড়তি টাকা। সেবাপ্রার্থীর প্রতি কর্মচারীদের অবহেলা। ভ্রুক্ষেপহীন কর্মকর্তা। দিনের পর দিন হয়রানি—ভুক্তভোগীদের কাছে সারা দেশে এই হলো ভূমি কার্যালয়ের সাধারণ চিত্র। পবার ভূমি অফিসও একসময় তা-ই ছিল। কিন্তু সবকিছু বদলে দিয়েছেন একজন শাহাদত হোসেন।
সম্প্রতি এই ভূমি কার্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, চত্বরে বোর্ডে নাগরিক সনদ টাঙানো। তাতে জমির নামজারি করতে কত টাকা লাগে, খতিয়ান তুলতে কত টাকা লাগে, খাসজমি বন্দোবস্ত নিতে কী করণীয়, কোন বিষয়ে কার সঙ্গে কীভাবে যোগাযোগ করতে হবে—সব তথ্য লেখা। বারান্দায় উঠতেই হাতের ডান পাশে ‘সেবাঙ্গন’ নামে একটি হেলপ ডেস্ক। সেখানে একজন কর্মচারী বসে আগতদের তথ্য সহায়তা দেন। কার্যালয়ের বিভিন্ন কক্ষের ওপরে কর্মচারীদের নাম, শাখার নাম, কার কাছে কোন সেবা পাওয়া যাবে—তা লেখা। কর্মচারীদের গলায় ঝুলছে পরিচয়পত্র। প্রতিটি কক্ষে ছোট সাদা বোর্ডে কর্মচারীদের প্রতিদিনের কাজ লেখা। দিন শেষে এসি ল্যান্ড সেগুলো ধরে মূল্যায়ন করেন। একটি বড় ডিসপ্লে বোর্ডে কোন ধরনের মামলার শুনানি কোন দিন, তা লেখা। কার্যালয়ের সামনে দিয়ে সোজা ভেতরে গেলে একটি ‘সাইকেল শেড’। দূরদূরান্ত থেকে অফিসে আসা লোকজন সাইকেল ও মোটরসাইকেল রাখেন সেখানে। দোতলায় প্রথমা, দ্বিতীয়া ও তৃতীয়া নামে শ্রেণীকরণ করা নথির সারি। গত ১৭ জুলাই মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিব মোশাররাফ হোসাইন ভূইঞা পবা ভূমি অফিস ঘুরে দেখে পরিদর্শন বইয়ে লিখেছেন, ‘এই দৃষ্টান্ত সারা দেশের ভূমি অফিস অনুসরণ করুক, এই কামনা করি।’
ভূমি কার্যালয়ের চিরচেনা দালালের দল কোথায় গেল—জানতে চাইলে একজন কর্মচারী বললেন, তাঁরা এখন আর এখানে ঢুকতে পারেন না। অনেকে পেশা ছেড়ে দিয়েছেন। দু-একজন এলেও বাইরে দোকানে বসে থাকেন। রফিক উদ্দিন নামের এ রকম একজনকে বাইরে পাওয়াও গেল। তিনি প্রথম আলোকে বললেন, ‘একবার কয়েকজনকে ধরে বের করে দেওয়া হয়। তাঁদের অবস্থা দেখে এই পেশাই ছেড়ে দিয়েছি।’কলেজশিক্ষক আনোয়ার হোসেনের (৩৫) বাড়ি পবা উপজেলার কাঁটাখালি পৌর এলাকায়। বছর দুয়েক আগে তিনি এই কার্যালয়ে জমির নামজারি করার জন্য এসেছিলেন। তিনি বলেন, ‘সার্ভেয়ারের জন্য দুই ঘণ্টা অপেক্ষা করেছি। আসার পর কত নম্বর কেস জানতে চাইলেন। শুনে বললেন, দুই দিন পরে আসেন। আবার গেলাম। তিনি বললেন “আজ খুব ক্লান্ত।” ফিরে যেতে হলো। এরপর বহুবার সেখানে যেতে হয়েছে।’আনোয়ার হোসেন বলেন, দুই মাস আগে তিনি ভূমি কার্যালয়ে গিয়ে রীতিমতো বিস্মিত। এসি ল্যান্ড বাইরে টিনশেডে চেয়ার পেতে বসা। তাৎক্ষণিক মানুষের কথা শুনে সমাধান দিচ্ছেন। ডিসিআর (নামজারির পর দেওয়া বিকল্প রসিদ) দরকার ছিল তাঁর। এসি ল্যান্ড শুনলেন, দেখলেন এবং সঙ্গে সঙ্গে রসিদ কেটে দিলেন। আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘জীবনে এ রকম দৃশ্য কল্পনা করিনি। এটা দেখে দুই বছর আগের অপমানের কষ্ট ভুলে গেছি।’
একই অনুভূতি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের শিক্ষক গোলাম রাব্বানির। চার বছর ঘোরার পর সম্প্রতি তিনি তাঁর কেনা একখণ্ড জমি নামজারি করাতে পেরেছেন। তিনি বলেন, ‘এখন মনে হয়েছে এই কার্যালয়ের কর্মকর্তারা একটু আন্তরিক হলে কাজটা আগেই করতে পারতেন। এসি ল্যান্ডের আন্তরিকতা দেখে আমি অভিভূত। শাহাদত একটা মডেল।’একই অভিজ্ঞতার কথা জানা গেল বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মচারী ফারুক হোসেনসহ কয়েকজনের কাছ থেকে। ৯০ বছর বয়সী ফাতেমা বেওয়া আদালতের রায় নিয়ে এসেও রেকর্ড সংশোধনের জন্য কয়েক বছর ধরে এই কার্যালয়ের সবার দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন। কিছুদিন আগে এসে দেখেন বড় সাহেব (এসি ল্যান্ড) নিজেই নিচে এসে মানুষের কথা শুনছেন। তাঁর সমস্যার কথা বলামাত্রই লিখে নিয়ে শুনানির দিন দিলেন। নির্ধারিত দিনে শুনানি হলো। তাঁর নামে রেকর্ড সংশোধনের আদেশ দিলেন। এবার তিনি ওই জমির নামজারির আবেদন করতে এসেছেন।
পবা উপজেলা ভূমি কার্যালয়ে সেবাদানের ক্ষেত্রে এই ইতিবাচক পরিবর্তন এনেছেন সহকারী কমিশনার (ভূমি) শাহাদত হোসেন (৩৬)। তাঁর বাড়ি কিশোরগঞ্জে। তিনি দুই বছর আগে রাজশাহীর এই কার্যালয়ে যোগ দেন। তিনি এসে দেখেন তাঁর কার্যালয়ের নিচে দালালের দল। তাঁরা নিজেদের ভূমি অফিসের লোক বলে পরিচয় দিতেন। কাজের জন্য কেউ এলেই পড়তেন এঁদের খপ্পরে। দোতলায় বসেন তিনি। তাঁর কাছে কেউ যেতে পারতেন না। দালালেরা লোকজনকে জিম্মি করে দিনের পর দিন ঘোরাতেন। ৫ টাকার কাজে ৫০ টাকা আদায় করে ছাড়তেন। এ অবস্থা দেখে শাহাদত হোসেন নিজেই নিচে নেমে এলেন। এ জন্য একটা টিনশেড করে নিয়েছেন। নাম দিয়েছেন ‘মাটির মায়া’। সেবাগ্রহীতাদেরও বসার জায়গা করা হয়েছে। সেখানে নারী ও প্রতিবন্ধীরা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বসতে পারেন। সাত মাস ধরে এভাবে চলছে।
পবা ভূমি কার্যালয় সূত্র জানায়, নতুন প্রক্রিয়ায় গত সাত মাসে দুই হাজারের বেশি সেবাপ্রার্থীকে প্রতিকার ও পরামর্শ দেওয়া সম্ভব হয়েছে। আগের সাত মাসে এর সংখ্যা ছিল এক হাজারের কম। গত এক বছরে বিবিধ মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে ১৭৩টি। এর আগের এক বছরে হয়েছিল মাত্র ৪০টি। বিবিধ মামলার মধ্যে পড়ে রেকর্ড সংশোধন, আগের খারিজ বাতিল, রেকর্ডের ছোটখাটো ভুল সংশোধন, আদালতের আদেশে রেকর্ড সংশোধন ইত্যাদি।পবা ভূমি কার্যালয়ের কানুনগো হাবিবুল ইসলাম বলেন, আগে সেবাপ্রার্থীদের এক টেবিল থেকে আরেক টেবিলে ঘুরতে হতো, কর্মচারীদেরও হাতের কাজের ক্ষতি হতো। কর্মচারীদের পরামর্শে সন্তুষ্ট না হলে শেষ পর্যন্ত তারা সহকারী কমিশনারের কাছেই যেত। এখন তারা আগেই সর্বোচ্চ কর্মকর্তা সহকারী কমিশনারের কাছে যাচ্ছে। তিনি তাৎক্ষণিক পরামর্শ দিচ্ছেন অথবা নির্দিষ্ট কর্মচারীকে ডেকে কাজটা বুঝিয়ে দিচ্ছেন। এতে কাজের গতি বেড়েছে। ঝামেলা কমেছে।
তবে এই সেবা চালুর জন্য দেড় বছরের প্রস্তুতি লেগেছে। এই সময়ে সহকারী কমিশনার দেড় লাখের মতো নথি ক্রমানুসারে সাজিয়ে প্রতিটির সঙ্গে ট্যাগ লাগিয়ে দিয়েছেন। নথিগুলোকে প্রথমা, দ্বিতীয়া ও তৃতীয়া নামের তিনটি কক্ষে এমনভাবে সাজিয়েছেন, এখন যেকোনো নথি এক মিনিটের মধ্যে খুঁজে পাওয়া সম্ভব। আগে একটা নথি খুঁজে বের করতেই দিন পার হয়ে যেত। নথি খোঁজার জন্য কাউকে কাউকে ‘খুশি’ করতে হতো। ভূমি কার্যালয়ের পরিদর্শন খাতায় উপজেলার কুখন্ডি গ্রামের আবদুল কাদের লিখেছেন ‘আমার জীবনে এই প্রথম বাড়তি টাকা ছাড়া অল্প সময়ে জমি খারিজ করতে পারলাম। আমি অত্যন্ত খুশি।’
শাহাদত হোসেন প্রথম আলোকে বললেন, ‘বিভাগীয় কমিশনার স্যারের প্রেরণায় এই কাজটি শুরু করেছিলাম। ইতিমধ্যে সমস্ত রেজিস্টার নির্ধারিত সরকারি ফরমে লাল সালু কাপড়ে বাঁধাই করে সংরক্ষণ ও হালনাগাদ করা হয়েছে। নামজারি ও বিবিধ মামলার শুনানির তারিখ বাদী ও বিবাদীকে মোবাইলে খুদে বার্তার (এসএমএস) মাধ্যমে জানিয়ে দেওয়া হচ্ছে। উপজেলা ভূমি অফিসের একটি ওয়েবসাইটের মাধ্যমে নামজারি ও বিবিধ মামলাসহ অন্যান্য আবেদন অনলাইনে দাখিল করার সুযোগ করা হয়েছে। বিভিন্ন মামলার সর্বশেষ অবস্থাও ওয়েবসাইট থেকে জানা যাবে। জানানো যাবে যেকোনো অভিযোগ। উপজেলা ভূমি অফিসের ফেসবুক পেজেও এসি ল্যান্ডের কাছে যেকোনো সমস্যা জানানো যাবে।’ তিনি বলেন, আরেকটি বড় কাজ বর্তমানে চলমান রয়েছে। তা হলো, জমির আরএস খতিয়ান স্ক্যান করে ডিজিটাল ফরমেটে অনলাইনে দেওয়া।
রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনার হেলালুদ্দীন আহমেদ বলেন, এটি শাহাদত হোসেনের একটি উদ্ভাবনী উদ্যোগ। এই মডেলটাকে তিনি রাজশাহী বিভাগের সব উপজেলায় চালু করার উদ্যোগ নিয়েছেন। এর জন্য দুই মাস অন্তর বিভাগের সব এসি ল্যান্ডকে নিয়ে এই কার্যালয়ের কার্যক্রমের ভিডিওচিত্র দেখানো হয়। পরামর্শ দেওয়া হয়। গত ২৩ আগস্ট পবা ভূমি কার্যালয়ে কাজে এসেছিলেন রাজশাহীর মুক্তিযোদ্ধা শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, ‘৬৫ বছরের জীবনে বাংলাদেশের বাস্তবতায় এই সেবা আমাকে মুগ্ধ করেছে। বাংলাদেশের জনগণ এ ধরনের সেবাই প্রত্যাশা করে।’