রবিবার, 07 ফেব্রুয়ারী 2016 11:31

চরাঞ্চলে ভূমিহারাদের কান্না

দৈনিক ইত্তেফাক || সেদিন একটি টিভি চ্যানেলে হাতিয়ার দুর্গম চর এলাকার উদ্বাস্তু মানুষের ওপর ভূমিদস্যুদের নির্মম তাণ্ডবের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন দেখলাম। এই একবিংশ শতকে যখন মহাশূন্যে গ্রহে-উপগ্রহে বসবাস করার সম্ভাবনা যাচাই করার পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে, তখন এদেশের কিছু প্রত্যন্ত এলাকা যেন এখনো আদিম ভূমির মতো, যেখানে যা ইচ্ছে তাই করা যায়! সেখানে অরাজকতার শিকার দরিদ্রপীড়িত উদ্বাস্তু মানুষেরা কী এক মসীকৃষ্ণ অন্ধকার যুগে আবদ্ধ হয়ে আছে!

টেলিভিশনের প্রতিবেদনটি দেখতে দেখতে মনে পড়ে গেল ২০০৩-০৪-এর দিকে নোয়াখালীর চরাঞ্চলের কথা। শোনা গিয়েছিল সে সময়ের এক প্রভাবশালীর নির্দেশে পনেরো-বিশজন কথিত ‘ডাকাত’দের পিটিয়ে মেরে ফেলা হয়! সে সময়ে কয়েকটি পত্রিকায় কয়েকজন স্বাস্থ্যবান যুবকের মৃতদেহের ছবি ‘ডাকাত’ হিসেবে ছাপা হয়েছিল! অনেক পরে, সম্ভবত এমনই একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে, কয়েকজন নারীর কান্নামেশানো উত্তর ছিল— ‘ওরা ডাকাত ছিল না!’ তাদের উত্তর ছিল— ওরা বরং ওই চরের ওপর শ্যেনদৃষ্টিধারী লোভী ভূমিদস্যু ও তাদের দোসরদের প্রতিহত করে নিয়মিত পাহারা দিত। পাহারা দিয়ে তারা রক্ষা করত দরিদ্র কৃষিজীবীদের ভূমি, প্রাণ, স্ত্রীদের ইজ্জত, খেতের শস্য ইত্যাদি। সে দিন ওসব কথা শুনে বাক্যহারা হয়েছিলাম! আজ এই ২০১৬-তে দাঁড়িয়েও নতুন করে বাক্যহারা হলাম। চরের নারী, পুরুষ, শিশু-কিশোরদের ওপর ভূমিদস্যুদের অবর্ণনীয় নির্যাতন, ধর্ষণ, ধর্ষণের ফলে মায়ের মৃত্যুর বর্ণনা আট বছরের শিশুটির মুখে শুনি— ‘ওরা মাকে মারতে মারতে মেরে ফেলে, ওরা আমার মায়ের পেটে থাকা ভাইটাকেও মেরে ফেলে।’
শিশুটির কান্না— যার সামান্য বিবেক আছে, মমতা আছে— তাকেও অশ্রুসজল করবে। বিস্ময় জাগে, এই পৃথিবীর কিছু অঞ্চল এখনো কি প্রাচীন ও অন্ধকার যুগের নিয়মে চলবে? এই অবর্ণনীয় দুর্দশা ও নির্যাতন বন্ধ করতে সরকারের সাহায্যের হাত কেন ওসব চরম নির্যাতিত নারী-পুরুষ-শিশুর কাছে পৌঁছায় না? সরকারের নিরাপত্তার হাত কি এতই ছোট? আমাদের দেশের তথাকথিত কিছু ব্যবসায়ী ব্যাংকঋণ নিয়ে ব্যবসা না করে জমি-ফ্ল্যাট কেনেন। অনেকে আবার আমদানী পণ্যের মূল্য বেশি দেখিয়ে দেশের অর্থ বিদেশে পাচার করেন। সম্প্রতি জানা গেল— সরকারকে আয়কর দেয়নি এরকম কোটিপতি রয়েছে অসংখ্য। এভাবে চললে সরকারের ‘দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালন’ করবে কি করে?
দেশের বিভিন্ন দুর্গম চর এলাকায় যারা বসতি স্থাপন করেন, তাদের বেশির ভাগই নদী ভাঙনের শিকার দরিদ্র জনগোষ্ঠী। নদীর পাড়ে যুগ যুগ ধরে বসবাসের কারণেই তারা নির্ভীক। নদীর সঙ্গে যুঝেই তাদের জীবন কেটেছে। তারপরও দুর্গম চর এলাকায় এসব অকুতোভয় নারী-পুরুষের বসতি রক্ষার লড়াই কখনো কখনো অত্যন্ত নির্মম হয়। হাতিয়ার ওই চরের অসংখ্য নারী ভূমিদস্যুদের দ্বারা বারবার ধর্ষিত হয়েছে। যারা বেঁচে আছে তারা তাদের স্বামী-পুত্রদের প্রাণের বিনিময়ে দস্যুদের কাছে নিজের সম্ভ্রম দিয়েছেন— এ কথা তারা নিজেদের মুখেই বলেছেন। একাত্তরের বীরাঙ্গনাদের পর চরাঞ্চলের এইসব নারীরা যেন আমাদের কাছে নতুন আরেক লড়াই-এর রূপ উন্মোচন করেছেন! কোথাও কোথাও তারা বিতাড়িতও হয়েছেন। তারপর নতুন চরে মাথা গোঁজার ঠাঁই তৈরি করে পুনরায় শুরু করেছেন জীবন সংগ্রাম। সেসব নতুন বসতিতে দু-তিনটি বাঁশের বেড়া, একটি চাল দাঁড় করিয়েছে, ভিতরে একটি চুলা, অন্য কোনো আসবাব নেই। একটি বা দুইটি হাঁড়ি, একটি দুইটি থালা— এইসব নিয়েই নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখেন তারা। ভূমি খেকো দস্যুদের অব্যাহত নির্যাতনের মুখে বাধ্য হয়ে নদী ভাঙা মানুষ এভাবে নতুন স্থানে ঠিকানা তৈরির অবিশ্বাস্য এক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
সব সমস্যার যেমন সমাধান আছে, এ সমস্যারও নিশ্চয়ই সমাধান সম্ভব। যদি মাননীয় সংসদ সদস্যরা নিজ নিজ এলাকায় নদী ভাঙনের শিকার প্রকৃত উদ্বাস্তু মানুষের জন্য চরের ভূমি বণ্টন করেন, তাহলে এর একটি সমাধান বের হতে পারে। তাছাড়া ওইসব চরের ভূমিগ্রাসী ও তাদের গুণ্ডা-ক্যাডারদের তালিকা তৈরি করা প্রয়োজন। ভূমিগ্রাসীদের পোষা বিভিন্ন অপরাধীদের গ্রেফতার করে প্রকৃত আইনের আওতায় আনতে হবে। এটা সম্ভব হলে ওইসব এলাকায় শান্তি ফিরে আসতে পারে। কারণ, প্রভাবশালী ভূমিদস্যুরা নিজস্ব অপরাধী বাহিনী ছাড়া ক্ষমতাহীন। তবে টাকার জন্যও সাধারণ মানুষ অনেক সময় অপরাধকর্মে ভাড়া খাটে। যেমন, ভূমিগ্রাসীদের এক ধর্ষক অপরাধী জানিয়েছে, ওদের এসব অন্যায় কাজ করতে ভালো লাগে না, বাধ্য হয়ে ওরা এসব অপরাধ করে! দেখা যাচ্ছে— ওরা যদি অন্য কোনো স্বাভাবিক জীবিকা পায় এবং ভূমিগ্রাসীদের চাপ ওদের ওপর না থাকে, তাহলে ওরাও সব অপকর্মে শরিক হবে না। এজন্য পিছিয়ে থাকা এসব অঞ্চলে স্কুল, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, রাস্তা, সেতু, বাজার হাট নির্মাণসহ হাঁস-মুরগি-গরু-ছাগল পালন ও বিভিন্ন শস্য চাষাবাদের ব্যবস্থা করতে হবে।

এভাবে নদীভাঙনে সর্বস্বান্ত দরিদ্র মানুষ তাদের শান্তির আবাস নির্মাণের সুযোগ পেতে পারেন নতুন ক্ষুদ্র চর-ভূমিতে।