বুধবার, 24 ফেব্রুয়ারী 2016 12:25

পদ্মার চরে ‘ভূমিহীন’, শহরে আছে ফ্ল্যাট বাড়ি

দৈনিক ইত্তেফাক || পদ্মার চরে ভূমিহীন হিসেবে বাড়ি ও ফসলের জমি বরাদ্দ পেয়েছেন আহাদ আলী। অথচ রাজশাহী শহরেই তাঁর পাকা বাড়ি রয়েছে। তিন ছেলের নামে রয়েছে তিনটি দোকান। এক ছেলে সরকারি চাকরি করেন। শুধু আহাদ আলী নন, তার মতো বাড়ি করার জন্য জমি ও সরকারি অনুদানপ্রাপ্ত ১৫০ জনের অনেকেই রয়েছেন কোটিপতি। তারাই ভূমিহীন সেজে চরের জমি বরাদ্দ নিলেও শহরে রয়েছে তাদের ফ্ল্যাট বাড়ি-ঘরসহ নানা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। এদিকে চরে বসবাসকারী অনেক ভূমিহীন রয়েছেন, যারা সরকারি অনুদান পাননি। তাদের সরকারি অনুদান দিলে নিজেরা উপকৃত হবেন। কিন্তু বিশেষ ‘সুবিধার বিনিময়ে’ স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা করেছেন উল্টো কাজ। জনপ্রতিনিধিরা সুবিধাভোগী কিছু মানুষকে ভূমিহীন সাজিয়ে সরকারি অনুদান পেতে সহায়তা করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এনিয়ে চরের প্রকৃত ভূমিহীনদের মাঝে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষের সৃষ্টি হয়েছে।
সম্প্রতি কথিত ওইসব ভূমিহীনদের মাঝে প্রধান অতিথি হিসেবে সরকারি অর্থ ও উপকরণ বিতরণ করেছেন বিভাগীয় কমিশনার হেলালুদ্দীন আহমদ। সরকারিভাবে প্রদত্ত সুবিধার মধ্যে রয়েছে, ১৫০ জনের প্রত্যেককে চাষাবাদের জন্য তিনবিঘা এবং বাড়ি করার জন্য আরো ১০ কাঠা করে জমি, ২০ কেজি করে চাল ও দুই কেজি করে আলু। এছাড়া সরকারি টাকায় ৫টি সোলার, ৫টি টয়লেট ও ৫টি নলকূপ বিতরণ করা হয়। এ ব্যাপারে বিভাগীয় কমিশনার হেলালুদ্দীন আহমদ বলেন, ‘যারা চরে বসবাস করেন, তাদের তালিকা করে চাষাবাদ ও বসবাসের জমিসহ সোলার, নলকূপ ও টয়লেট দেয়া হয়েছে। তবে জমি স্থায়ীভাবে দেয়া হয়নি।’
স্থানীয় বাসিন্দা এমদাদুল হক জানান, পদ্মার চরে যারা সরকারি জমি ও অন্যান্য জায়গা পেয়েছেন তাদের প্রায় সকলেরই শহরে জমি, পাকা বাড়ি, ফ্ল্যাট, দোকান কিংবা অন্যান্য ব্যবসা রয়েছে। তিনি চ্যালেঞ্জ করে বলেন, ‘সরকারি সুবিধাপ্রাপ্ত ১০ জন মানুষও দুস্থ নন। প্রত্যেকের শহরে বাড়ি আছে, জমি আছে, গরু আছে। এখানে জায়গা পেয়ে তারা বাগান বাড়ি হিসেবে ঘর করে ব্যবহার করছেন। এদের বড় একটি অংশই চরের সরকারি ঘরকে চোরাচালানের কাজে লাগায়।’তার কথার সূত্র ধরে চরে জমি পাওয়া নগরীর মতিহার থানার মিজানের মোড় এলাকার আহাদ আলীর চরের বাড়িতে গিয়ে পাওয়া গেলো তার স্ত্রী লালমতি বেগমকে। লালমতি জানালেন, তার তিন ছেলের তিনটি দোকান রয়েছে নগরীর বিনোদপুর বাজারে। আরেক ছেলে সাজ্জাদ হোসেন সরকারের খাদ্য বিভাগের- ‘ফুড ইন্সপেক্টর’ পদে চাকরি করেন। তিনি আরো জানান, মিজানের মোড়ে চার রুমের একটি ফ্ল্যাট বাড়িও আছে তাদের। সেখানে ছেলেরা থাকেন। জমি ও গরু দেখাশোনার জন্য তারা চরের বাড়িতে থাকেন। চরে লালমতি পেয়েছেন একটি আধাপাকা টয়লেটও।
তার বাড়ির পাশেই নগরীর ডাঁশমারীর কুরবান আলীর বাড়ি। বাড়িতে পাওয়া গেলো তার স্ত্রী বুলুজানকে। শহরে তার বাড়ি থাকার কথা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘দুই ব্যাটা সুরমান আলী আর জারমান আলী গরুর ব্যবসা করে। দুইটা ছাদ দেয়া পাকা বাড়ি আছে। ওরা ওখানেই থাকে। মহিষ আর জমির ফসল দেখার জন্য আমরা এখানে (চরে) থাকি।’চরের বাড়িতে একটি নলকূপ পেয়েছেন নগরীর মিজানের মোড়ের আরেক বাসিন্দা জালাল উদ্দিন। তার বাড়ি গিয়ে পাওয়া গেলো তার স্ত্রী সোনাভান বিবিকে। জানতে চাইলে তিনিও স্বীকার করেন শহরের মিজানের মোড়ে তাদের ফ্ল্যাট বাড়ি থাকার কথা। তিনি বলেন, ‘আমাদের ২৫টা গরু আছে। এই বাড়িতে রেখে পুষি। জমির ফসল তুলি। ওইপাড়ে (শহরে) ছাদ ঢালাই বাড়ি আছে। ছেলে মেয়েরা সেখান থেকে পড়ে।’
নগরীর ডাঁশমারীর হাশেম আলীর ছেলে আব্দুর রশিদের চরের বাড়িতে গিয়ে কথা হয় তার স্ত্রী জাহানারা বেগমের সঙ্গে। তিনি বলেন, শহরে ছাদ দেয়া তিন রুমের বাড়ি আছে। সেখানে ছেলে মেয়েরা থাকে। এখানে জমির ফসল তুলতে এই চরে বাড়ির প্রয়োজন ছিল। এ ব্যাপারে হরিয়ান ইউপি’র চেয়ারম্যান মফিদুল ইসলাম বাচ্চু বলেন, ‘শহরে কিছু মানুষের বাড়ি আছে এ কথা সত্য। তবে যারা অভিযোগ করেছে তারা সবাই শহরের মাস্তান। চরের জমি দখল করে তারা ফসল চাষ করে। এ কারণে তারা অভিযোগ করেছে।’ পবা উপজেলা নির্বাহী অফিসার সেলিম হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, ‘শহরে কারো কারো বাড়ি আছে এমন অভিযোগ পেয়েছি। তবে সময়ের অভাবে যাচাই-বাছাই করতে পারিনি। আগামীতে সরকারি অনুদান দিলে যাচাই করে দেয়া হবে।’