সোমবার, 25 জুলাই 2016 10:43

ভূমি ব্যবস্থাপনায় নানা জোড়াতালি

সমকাল || অধিকাংশ পদই শূন্য দেশের নানা স্থানের ভূমি অফিসে; নিচের পদের কর্মকর্তারা কাজ করছেন উচ্চ পদে। কাজ না বুঝলেও তা করতে হচ্ছে তাদের। কারণ জনবল নিয়োগ-সংক্রান্ত মামলা থাকায় শূন্য পদগুলোতে কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ দিতে পারছে না সরকার। বিভিন্ন অফিসের অবস্থা এমন হওয়ায় মাঠ পর্যায়ের ভূমি ব্যবস্থাপনা চলছে 'ধর তক্তা মার পেরেক' পদ্ধতিতে। একজনের জায়গাজমির নামজারি হচ্ছে আরেকজনের নামে। ভুয়া দলিলে অন্যের জমি দখলের ঘটনাও ঘটছে। ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে একাধিকবার। কিন্তু জনবল সংকট কাটেনি, সফলতাও আসেনি। ভূমি অফিসে কানুনগো একটি গুরুত্বপূর্ণ পদ। কিন্তু ২৭ বছর ধরে এ পদে কোনো নিয়োগ দিতে পারছে না ভূমি মন্ত্রণালয়। দেড় শতাধিক সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা এসি (ল্যান্ড) পদে কোনো কর্মকর্তা নেই। সহকারী ভূমি হুকুম দখল কর্মকর্তা (এএসও) পদেও নেই প্রয়োজনীয় জনবল। অন্য পদ-পদবিগুলোর অবস্থাও একইরকম। ফলে হালচাল পাল্টাচ্ছে না অফিসগুলোর। এদিকে চলতি ও আগামী মাসে আরও কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী অবসরে যাচ্ছেন। ফলে আশঙ্কা করা হচ্ছে, দক্ষ কর্মকর্তা-কর্মচারী সংকটে ভূমি অফিসের অবস্থা আরও নাজুক হবে।

এ বিষয়ে ভূমি প্রতিমন্ত্রী মো. সাইফুজ্জামান চৌধুরী সমকালকে বলেন, 'দায়িত্ব নেওয়ার পর মন্ত্রণালয়ের প্রথম বৈঠকেই জানতে পারি, মাঠ পর্যায়ে ভূমি ব্যবস্থাপনার সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তা-কর্মচারীর অনেক পদ শূন্য আছে। কিন্তু জনবল নিয়োগ-সংক্রান্ত মামলা থাকায় দ্রুত জনবল নিয়োগ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। আমরা আইন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলেছি। দ্রুত মামলাগুলো নিষ্পন্ন করে জনবল নিয়োগ দেব।'

বেশি সংকট কানুনগো পদে : ভূমি মন্ত্রণালয় ১৯৮৯ সাল থেকে একাধিকবার কানুনগো পদে জনবল নিয়োগের উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু সম্ভব হয়নি। ইতিমধ্যে অনেকে অবসরে গেছেন। সরকার কর্মচারীদের চাকরির মেয়াদ দুই বছর বাড়ানোর ফলে কেউ কেউ অতিরিক্ত সেবা দিয়েছেন। এদিকে অনেক স্থানে সহকারী কমিশনার (ভূমি) পদের কর্মকর্তার দায়িত্বও পালন করতে হচ্ছে কানুনগোদের। দেশে বর্তমানে সহকারী কমিশনারের (ভূমি) মঞ্জুরিকৃত পদ ৪৮৭টি। সেখানে কাজ করছেন ৩৪১ জন। কর্মকর্তা না থাকায় এক উপজেলার কর্মকর্তাকে অন্য উপজেলার দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু তারা কাজ করাচ্ছেন কানুনগোদের দিয়ে। এভাবে সহকারী কমিশনারদের (ভূমি) ১৪৬টি শূন্য পদে অলিখিতভাবে কাজ করছেন কানুনগোরা। দ্বিতীয় শ্রেণির পদ হলেও কর্মকর্তার অভাবে তারাই অফিস প্রধানের দায়িত্ব পালন করছেন।

বর্তমানে সহকারী ভূমি হুকুম দখল কর্মকর্তার (এএসও) ৫০টি পদ শূন্য রয়েছে। এএসও পদটি প্রথম শ্রেণির। এসব পদেও দায়িত্ব পালন করছেন দ্বিতীয় শ্রেণিভুক্ত কানুনগোরা। মাঠ প্রশাসনে কানুনগোর মঞ্জুরিকৃত পদ এক হাজার ৫৯৭টি। কিন্তু বর্তমানে কাজ করছেন ৪৪৮ জন কানুনগো। এক হাজার ১৪৯টি কানুনগো পদ শূন্য রয়েছে। একেকজন কানুনগোকে একাধিক উপজেলায় চলতি দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, চলতি দায়িত্ব পাওয়ার জন্যও অনেকে লাখ লাখ টাকা খরচ করছেন। 

১৯৯৭ সালে কানুনগো, সার্ভেয়ার, চেইনম্যান ও অডিটর পদে জনবল নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দেয় ভূমি মন্ত্রণালয়। কিন্তু আইনি জটিলতায় শেষ পর্যন্ত শূন্যপদে নিয়োগ দিতে পারেনি ভূমি মন্ত্রণালয়। ২০০৪ সালে আবারও কানুনগোসহ বিভিন্ন শূন্য পদে জনবল নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দেয় ভূমি মন্ত্রণালয়। ২০০৫ সালের আগস্ট মাসে কানুনগো পদের লিখিত পরীক্ষার ফল প্রকাশ করা হয়। ৯৩ হাজার চাকরিপ্রত্যাশী পরীক্ষায় অংশ নেন। লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন সাড়ে ১২ হাজার জন। কিন্তু তার পর এক দশক পার হলেও মৌখিক পরীক্ষার জন্য উত্তীর্ণদের ডাকেনি ভূমি মন্ত্রণালয়।

দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে নিম্নপদধারীদের : প্রয়োজনীয় জনবলের অভাবে মাঠ পর্যায়ে প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তার পদে দ্বিতীয় শ্রেণির, দ্বিতীয় শ্রেণির কর্মকর্তা পদে তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী এবং তৃতীয় শ্রেণির পদে চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীরা দায়িত্ব পালন করছেন। ফলে ভূমি ব্যবস্থাপনায় নানা সংকট তৈরি হচ্ছে। দায়িত্বশীল কর্মকর্তার অনুপস্থিতির সুযোগে নামকাওয়াস্তে দায়িত্ব পালনকারী অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারী ব্যক্তিগতভাবে লাভবান হয়ে প্রকৃত মালিকের বদলে অন্য কারও নামে জমিজমা নামজারি করছেন। একদিকে সাধারণ মানুষের হয়রানি বাড়ছে, অন্যদিকে সরকারের কোটি কোটি টাকার রাজস্ব বেহাত হচ্ছে। এমনকি মূল্যবান সরকারি সম্পত্তিও চলে যাচ্ছে বেদখলে। 

সার্ভেয়ার পদে সংকট : দ্বিতীয় শ্রেণিভুক্ত কানুনগোর এক হাজার ১৪৯টি শূন্য পদে দায়িত্ব পালন করছেন তৃতীয় শ্রেণিভুক্ত সার্ভেয়াররা। সার্ভেয়ারের ১৮৬টি পদ বর্তমানে শূন্য রয়েছে। তাদের পদে দায়িত্ব পালন করছেন নামজারি সহকারীরা।

এ বিষয়ে ভূমি সচিব মেজবাউল আলম সমকালকে বলেন, জনবল সংকট দূর করা চেষ্টা করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে কয়েকটি পদে বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছে। সেগুলোতে দ্রুত নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে। কয়েকটি পদ নিয়ে আইনগত জটিলতা রয়েছে। সেসবও কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করা হচ্ছে।