বৃহস্পতিবার, 18 অগাস্ট 2016 11:46

ঋণ বিতরণে উপেক্ষিত কৃষি প্রযুক্তি খাত

কৃষি ঋণের মাত্র সাড়ে তিন শতাংশ যাচ্ছে প্রযুক্তি খাতে

দৈনিক ইত্তেফাক || শস্য রোপন ও মাড়াইয়ের মৌসুমে শ্রমিকের চাহিদা বেড়ে যায়। ফলে বাড়তি অর্থ দিয়ে শ্রমিক নিতে হয় কৃষকদের। তাতে ফসলের উৎপাদন খরচ বেড়ে যায়। আবার খরা মৌসুমে উন্নত সেচ যন্ত্রের অভাবে নষ্ট হয় ফসল। যার কারণে কৃষকরা ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখিন হন। অথচ এ খাতে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করলে ফসল উৎপাদন কয়েকগুণ বাড়বে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে দেখা গেছে কৃষি খাতে যে পরিমাণ ঋণ যাচ্ছে তার মাত্র সাড়ে তিন শতাংশ যাচ্ছে প্রযুক্তি ও সেচ যন্ত্রাংশ ক্রয়ে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন এ চিত্র হতাশাজনক। দেশের অগ্রসরমান কৃষি খাতে প্রযুক্তির ব্যবহার যদি সমানতালে না আগায় তাহলে কাঙ্খিত ফল পাওয়া সম্ভব নয়।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো তাদের মোট বিতরণ করা ঋণের দুই শতাংশ  কৃষি খাতে বিতরণ করবে বলে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে থাকে। এজন্য কৃষি ও পল্লী ঋণের জন্য খাত ও উপখাত ভিত্তিক ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করতে হয়। খাতগুলো হলো শস্য বা ফসল (ধান, গম, ডাল, তৈলবীজ ইত্যাদি), মৎস্য সম্পদ, প্রাণিসম্পদ, কৃষি যন্ত্রপাতি (ব্যবহারকারী পর্যায়ে প্রদত্ত ঋণ), সেচ যন্ত্রপাতি (ব্যবহারকারী পর্যায়ে প্রদত্ত ঋণ), বীজ উৎপাদন, শস্যগুদাম ও বাজারজাতকরণ, পল্লী অঞ্চলের দারিদ্র্য বিমোচন ও আয় উৎসারী কর্মকান্ডে ঋণ বিতরণ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘বাংলাদেশের কৃষি ঋণের ব্যবহার এবং প্রভাব নির্ধারণ’ শীর্ষক গবেষনায় দেখা গেছে, সামগ্রীক কৃষি খাতে বিতরণকৃত কৃষি ঋণের প্রায় ৭৩ শতাংশই ব্যবহার হচ্ছে শস্য খাতে। এর মধ্যে সরাসরি শস্য খাতে ৬৬ দশমিক ১৪, মসলা আবাদে তিন দশমিক ৩৮, শস্য সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণে দুই দশমিক ৮৮ শতাংশ। বিতরণকৃত এসব ঋণের মৎস্য চাষে সাত দশমিক ১২ এবং গবাদি পশুপালনের জন্য দুই দশমিক ৭৩ এবং অন্যান্য খাতসহ প্রায় ১২ শতাংশ কৃষি ঋণের তথ্য গোপন থাকছে। দেশের সাতটি বিভাগের ৩৩ টি জেলায় অবস্থিত ১০ টি বাণিজ্যিক ব্যাংকের দুই হাজার ঋণ-গ্রহীতার সাক্ষাতকার গ্রহনের মাধ্যমে পরিচালনা করা হয়। এসব বাণিজ্যিক ব্যাংকের বাছাইকৃত ৬০ টি শাখার গ্রাহকদের প্রধান্য দেওয়া হয়। যদিও ঋণ বিতরণে সেচ যন্ত্রপাতি ও কৃষি যন্ত্রপাতি খাতে ঋণ প্রদানের জন্য বিশেষভাবে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। চাষাবাদ পদ্ধতিতে যান্ত্রিকীকরণ এবং বিজ্ঞানসম্মত চাষাবাদ পদ্ধতির মাধ্যমে ফসল উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে কৃষি যন্ত্রপাতি যেমন- ট্রাক্টর, পাওয়ার টিলার, বারি বীজ বপন ও আগাছা নিড়ানি যন্ত্রে ঋণ বিতরনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তাছাড়া ফসল কাটা ও মাড়াইয়ের যন্ত্র এবং পাওয়ার থ্রেসার, পাওয়ার ইউনোনেয়ার ও ড্রায়ার কেনায় কৃষি ঋণ বিতরণ শ্রম সংকট ও উৎপাদন খরচ কমায় বিধায় ঋণ বিতরনের নির্দেশনা আছে। কিন্তু এত নির্দেশনার পরও ঋণ বিতরনে উপেক্ষিত থেকেই যাচ্ছে কৃষি যন্ত্রপাতি খাত। বিভিন্ন ধরনের যন্ত্রপাতি ব্যবহারে ঋণ প্রদানের নির্দেশনা থাকলেও এ সময়ে সেচ যন্ত্রপাতি ক্রয়ে ব্যবহার হয়েছে মাত্র ৩ দশমিক ৫২ শতাংশ।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের কৃষি ঋণ বিভাগের মহাব্যবস্থাপক প্রভাষ চন্দ্র মল্লিক বলেন, কৃষি প্রযুক্তি ও সেচযন্ত্র ক্রয়ে ঋণ দেয়ার জন্য ব্যাংকগুলোকে উৎসাহিত করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। কোন কৃষক একভাবে সেচযন্ত্র ক্রয় করতে না পারলে গ্রুপ ভিত্তিতে যাতে ক্রয় করতে পারে সেজন্যও ব্যাংকগুলোকে নির্দেশনা দেওয়া আছে। আর সেচ যন্ত্রের মত শস্য রোপন ও মাড়াইয়ের যন্ত্রের ব্যবহার বাড়ানোর বিষয়েও প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি। এ বিষয়ে পূবালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুল হালিম চৌধুরী বলেন, কৃষি ঋণ বিতরণে পূবালী ব্যাংক সব সময় লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করেছে। আর এ ঋণের সবটাই নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় দেয়া হচ্ছে। বর্তমানে ব্যাংকের প্রিন্সিপাল শাখা ও কাওরান বাজার শাখার মাধ্যমে বড় বড় ঋণ দেয়া হচ্ছে। আর এসব বড় ঋণের মধ্যে প্রযুক্তি ও সেচযন্ত্র ক্রয়ে বড় অংশ।

অর্থনীতিবীদরা বলছেন, ২০২১ সালের মধ্যে দেশকে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করতে প্রতি বছর ৭ শতাংশ জিডিপির প্রবৃদ্ধি দরকার। সেখানে কৃষিক্ষেত্রে কমপক্ষে চার থেকে সাড়ে শতাংশ প্রবৃদ্ধি ছাড়া অর্জন করা সম্ভব নয়। সেটি অর্জনে ক্রমহ্রাসমান আবাদী জমিতে উন্নত উপকরণ ও নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারে জোর দিতে হবে। তাছাড়া শস্য খাতে উৎপাদন এখন সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। আর সেটা ধরে রেখেই পর্যায়ক্রমে আরো উন্নত করতে অবশ্যই প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর কোন বিকল্প নেই। তাই কৃষিখাতকে টেকসই, সমৃদ্ধ এবং কৃষি ঋণকে অন্তর্ভুক্তিমূলক করতে কৃষি যান্ত্রিকীকরণের ওপর ব্যাংকগুলো জোর দিচ্ছে বলে জানান তারা। জানা গেছে, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ৬টি বাণিজ্যিক, ২ টি বিশেষায়িত ও ৩৮টি বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক, ও ৯টি বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংক মোট ১৭ হাজার ৬৪৬ কোটি ৩৯ লাখ টাকা কৃষি ও পল্লী ঋণ করে। বিতরণকৃত এ ঋণ লক্ষ্যমাত্রা থেকে প্রায় ৮ এবং পূর্ববর্তী বছরের চেয়ে প্রায় সাড়ে দশ শতাংশ বেশি। চলতি অর্থবছরে ১৭ হাজার ৫৫০ কোটি টাকা ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ কার হয়েছে।