বৃহস্পতিবার, 25 জুন 2015 15:17

ধ্বংস হচ্ছে মৎস্য সম্পদ

এটিএন টাইমস ।। মংলার পশুর নদী ও সুন্দরবনের চাঁদপাই এবং শরণখোলা রেঞ্জের ভোলা, বলেশ্বরসহ বনের বিভিন্ন নদ-নদীতে অবৈধভাবে চলছে চিংড়ি পোনা ধরার মহোৎসব।
উপকুলীয় এলাকার প্রভাবশালীরা সুন্দরবন ও নদী সংলগ্ন দরিদ্র জনগোষ্ঠীদের মাঝে লাখ লাখ টাকা দাদন ছড়িয়ে (অগ্রিম প্রদান) দিয়ে এক প্রকার মৎস্য সম্পদ ধ্বংসের প্রতিযোগিতায় নেমেছে।
অভিযোগ উঠেছে, সংশ্লিষ্ট নৌ পুলিশ, উপজেলা মৎস্য বিভাগ ও বন বিভাগসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে প্রায় শতাধিক মৎস্য আড়তের মহাজনরা বা দাদন ব্যবসায়ীরা চালাচ্ছে অবৈধ চিংড়ি রেণু পোনার রমরমা ব্যবসা।
অনুসন্ধানে মংলা উপজেলার ছয়টি ও শরণখোলা উপজেলার চার ইউনিয়নে বসবাসরত প্রায় চার লাখ মানুষের মধ্যে বড় একটি অংশ দারিদ্র সীমার নীচে বসবাস করে। আর এ অবস্থায় স্থানীয় প্রভাবশালীরা তাদের দারিদ্রতার সুযোগ কাজে লাগিয়ে প্রতি বছর রেণুপোনা আহরণ মৌসুমের শুরুতে কয়েক কোটি টাকা (অগ্রিম প্রদান) দাদন দেয়। পোনা আহরণ, পরিবহন ও বাজারজাতকরণ আইনের দৃষ্টিতে নিষিদ্ধ হলেও তা মানছে না এ প্রভাবশালীরা।
প্রশাসনিক নজরদারীর অভাবে উপকুলীয় এলাকাগুলোতে চিংড়ি পোনা আহরণ করতে গিয়ে সংশ্লিষ্টরা শত শত প্রজাতির রেণু পোনা অংকুরে বিনষ্ট করছে। এ কারণে ইতিমধ্যে দেশের অন্যতম মৎস্য ভাণ্ডার খ্যাত সুন্দরবনের নদী নালা থেকে প্রায় শতাধিক প্রজাতির মাছ হারিয়ে গেছে।
একটি বেসরকারি সংস্থার হিসাব মতে একটি রেণু অথবা বাগদা চিংড়ির পোনা নদী থেকে আহরণ কালে বিভিন্ন প্রজাতির ২৫০/২৮০ টি পোনা বিনষ্ট করছে আহরণকারীরা। তাদের মতে দেশের এই জাতীয় সম্পদ ধ্বংসের সাথে যারা জড়িত তাদেরকে দ্রুত চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে না পারলে ভবিষ্যতে মৎস্য ভাণ্ডার খ্যাত সুন্দরবনের নদী নালাতে মৎস্য সম্পদ হুমকির মুখে পড়ার আশংকা রয়েছে।
প্রাকৃতিক পোনার উপর ভিত্তি করে আশির দশকে শুরু হয় উপকূলীয় অঞ্চলে লবণ পানির চিংড়ি চাষ। গত তিন দশকে আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় চিংড়ি চাষের ব্যাপক সম্প্রসারণ ঘটে। বাংলাদেশে বছরে তিন হাজার কোটি পোনার চাহিদা থাকলেও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ১৪৭টি চিংড়ি পোনার হ্যাচারিতে উৎপাদন হয় মাত্র এক হাজার কোটি পোনা।
এদিকে সরকার কর্তৃক নিষিদ্ধ থাকা সত্ত্বেও নদীর রেণু পোনা মংলা-খুলনা মহাসড়কের দিগরাজ বাজার, ঝনঝনিয়া (চেয়ারম্যানের মোড়) বাজার, ভাগা বাজার, ফয়লা বাজারসহ বিভিন্ন স্থানে খোলা বাজারে হাঁকডাক দিয়ে বিক্রি করছে এক শ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ী।
মংলার পোনা ব্যবসায়ী দেলোয়ার এ প্রসঙ্গে বলেন, হ্যাচারির পোনা উৎপাদন বন্ধ থাকায় তারা অবৈধ পন্থায় ব্যবসা করতে বাধ্য হচ্ছে। তাদের এ ব্যবসায় চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের বিভিন্ন মোকামে কয়েক লাখ টাকা দাদন দেয়া আছে বলেও জানান তিনি।
অভিযোগ রয়েছে, ব্যাপক চাহিদা ও জীবিকা নির্বাহের জন্য সহজ পন্থা হওয়ায় পুলিশ, মৎস্য বিভাগ ও বনবিভাগকে ম্যানেজ করে সুন্দরবন সংলগ্ন মংলার পশুর নদীতে উপকূলীয় অঞ্চলের এসব ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন বয়সের নারী-পুরুষ দিয়ে নির্বিচারে নেট জাল ব্যবহার করে বাগদা-গলদা পোনা আহরণ করছে।
তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করে পূর্ব সুন্দরবনের সহকারী বন কর্মকর্তা মো. বেলায়েত হোসেন দাবি করেন, উপকূলের ছিন্নমূল মানুষদের জীবিকার জন্য কেবল মাত্র তাদের সুযোগ দেয়া হয়। এ জন্য তাদের কাছ থেকে কোন রকম উপঢৌকন নেয়া বা অবৈধ লেনদেন করা হয়না।
মংলা উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা বিশ্বজিত কুমার দেব লেনদেনের কথা অস্বীকার করে বলেছেন, পর্যাপ্ত লোকবল ও নৌযান না থাকায় পোনা আহরণকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বেগ পেতে হয়।
এদিকে বন্দর ব্যবহারকারী এইচ এম দুলাল অভিযোগ করে বলেন, মংলা বন্দরের পশুর ও মংলা নদীতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা অসংখ্য রেণু বা চিংড়ি পোনা আহরণের নেট জালে দেশি-বিদেশি জাহাজ বন্দর আগমনে মারাত্মকভাবে মংলার চিলা ইউপি চেয়ারম্যান শেখ শফিকুল ইসলাম রাসেলের দাবি প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর দায়িত্ব অবহেলার কারণে বছরের পর বছর চলছে অবৈধ জাল দিয়ে এ পোনা শিকার।
আর এতে করে ১টি চিংড়ি পোনা ধরতে ধ্বংস করা হয় ৬ প্রজাতির মৎস্য ও একশ প্রজাতির জলজ প্রাণী। ১টি চিংড়ি পোনা ধরতে ২শ টি অন্য প্রজাতির মাছের পোনা ধ্বংস করা হয়।
তবে কোস্ট গার্ড মংলা সদর দপ্তরের জোনাল কমান্ডার ক্যাপ্টেন কাজী মেহেদী মাসুদ জানান, নিষিদ্ধ জাল বন্ধে নিয়মিত অভিযান চালিয়ে যাচ্ছেন তারা। আর এসব অভিযানে শুধু চার মাসে ৬০ কোটি টাকার অধিক মূল্যের অবৈধ জাল ও রেণু পোনা আটক করা হয়েছে।
মংলা-খুলনা মহাসড়কের ফয়লা বাজারের অসাধু ব্যবসায়ীদেরও শিগগিরই আইনের আওতায় এনে কঠোর ব্যবস্থা নেয় হবে বলেও তিনি জানান।