বুধবার, 01 জুলাই 2015 15:06

দক্ষিণাঞ্চলে দেশি মাছের আকাল

দৈনিক আজকালের খবর ।। নদী ও খালের অঞ্চল বরিশালসহ গোটা দক্ষিণাঞ্চলে প্রাচীনকাল থেকেই দেশি প্রজাতির মৎস্য ভাণ্ডার হিসেবে খ্যাতি ছিল। কিন্তু সময়ের ঘূর্ণিপাকে আজ তা হারিয়ে যেতে বসেছে। মানুষ বৃদ্ধির পাশাপাশি মাছের প্রজননকাল চৈত্র-বৈশাখ মাসে পুকুর-জলাশয় সেচ করে ডিমওয়ালা মাছসহ সব মাছ শিকারের মহোৎসব, বিদেশি মাছের চাষ, পানিতে লবাণক্ততার পরিমাণ বৃদ্ধি, জলাশয় পুকুর ভরাট ও জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে বিভিন্ন জলাশয় থেকে আজ একের পর এক দেশি প্রজাতির মাছ বিলুপ্তি হয়ে যাচ্ছে। দেশীয় প্রজাতির মাছ রক্ষায় ১৯৫০ সালে মৎস্য সম্পদ রক্ষা ও সংরক্ষণ আইন করা হলেও এখন পর্যন্ত তার কোনো সুনির্দিষ্ট দিক নির্দেশনা দেয়া হয়নি বলে জানিয়েছেন মৎস্য ও পরিবেশ অধিদফতরের কর্মকর্তারা। ফলে দিনে দিনে মাছের অভয়াশ্রম হিসিবে পরিচিত গোটা দক্ষিণাঞ্চলে দেশি মাছের সংকট প্রকট আকার ধারণ করছে।
এককালের চিরচেনা শিং, মাগুর, কই, টেংরা, পুঁটি, দারকিনা, পাবদা, বোয়াল, চিতল, রিঠা, বাইন, শোল, গজার, নিন্দাল, টাকি, ডানকিনে, খৈলশে, বাটা, কালিবাউশ, ঢেলা, আইড়, টেংরা, শালবাইন, কানিপাবদা, মধুপাবদা, পাবদা, চেকা, তিতপুঁটি, সরপুটি, তারাবাইন, ফলি, বামোশ, টাটকিনি, কাজুলি, গাং মাগুর, মেনি, লাউয়া, নামাচান্দা, রিঠা, ঘাউড়া, পাঙ্গাশ, বাটা, নান্দিনা, টিলাশোল, সরপুঁটি, মহাশোল, চান্দা, চেলা, ইচা, মেনিসহ অন্যান্য মাছ বংশ বিস্তার করতে পারছে না। বর্ষাকালে নির্বিচারে যত্রতত্রভাবে জেলেরা ডিমওয়ালা মাছ ধরার ফলেও মাছের বংশ বিস্তারে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। যে কারণে ক্রমেই মাছের দেশ দক্ষিণাঞ্চলে দেশি মাছের আকাল দেখা দিয়েছে।
দক্ষিণাঞ্চলে মেঘনা, কালাবদর, জয়ন্তী, সন্ধ্যা, সুগন্ধা, কীর্তনখোলা, আড়িয়াল খাঁ, পয়সারহাট, পালরদী, নয়াভাঙ্গনী, মাছকাটা, লতা, আইরখালী, পায়রা, ভাষানচর, বাগরজা, শিন্নিরচর, তেঁতুলিয়া, বাকেরগঞ্জের তুলাতলা, খয়রাবাদ, বেবাজ, কাতিভাঙ্গা, রাঙ্গামাটি তুলাতলী নদীসহ সর্বত্র অসংখ্য পুকুর, ডোবা-নালা ও খাল-বিল থাকলেও তাতে আগের মতো দেখা মিলছে না দেশীয় প্রজাতির মাছ। সূত্রমতে, দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকার জলাশয়, নদী ও খাল-বিল থেকে একসময় দেশি প্রজাতির মাছ ধরে বিক্রির মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করতেন এলাকার বিপুলসংখ্যক জনগোষ্ঠী। এ জন্য দক্ষিণের বিভিন্ন জনপদে গড়ে উঠেছিল মাছ বিক্রির আড়দত। এছাড়াও বিভিন্ন এলাকার মৎস্যজীবীরা নদী, পুকুর, খাল-বিল থেকে নিয়মিত দেশীয় মাছ ধরে হাট-বাজারে বিক্রি করে দিনাতিপাত করতেন। দিন-রাত ও ঝড় বৃষ্টি উপেক্ষা করে জেলেরা মাছ শিকার করে বাজারে বিক্রি করে পরিবার-পরিজন নিয়ে সুখেই ছিলেন। কিন্তু নির্বিচারে পোনা মাছ আহরণ, জমিতে রাসায়নিক সার ও অতিরিক্ত কীটনাশক প্রয়োগ, শিল্প কারখানার বর্জ্যতে পানি দূষণ ইত্যাদি কারণে দেশি মাছের বংশ বিস্তারে ব্যাঘাত ঘটায় গোটা দক্ষিণাঞ্চল থেকে ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে দেশি প্রজাতির মাছ। নদী, খাল-বিল ও পুকুরে আগের মতো দেশি মাছ না থাকায় ইতোমধ্যে জেলেরা তাদের বাপ দাদার পেশা ছেড়ে ভিন্ন পেশায় জড়িয়ে পড়েছেন। আবার অসংখ্য জেলে বেকার হয়ে পরিবার পরিজন নিয়ে এখন মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
বানারীপাড়া উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা প্রণব কুমার জানান, প্রতি বছর শুকনো মৌসুমে একাধিক খাল, বিল, পুকুর, ডোবা-নালা সেচের মাধ্যমে ডিমওয়ালা মাছসহ বিভিন্ন প্রকারের মাছ শিকার করা হয়। যেসব পুকুর সেচ দিয়ে মাছ শিকার করা হয় সেসব পুকুরে চিরতরে অস্তিত্ব হারায় দেশি মাছ। এছাড়াও প্রভাবশালীরা পুকুর সেচের পর রাতারাতি তা ভরাট করে সেখানে মার্কেটসহ বাড়িঘর তৈরি করেন। সূত্রমতে, হাউজিং কোম্পানির রমরমা ব্যবসায় এখন পুকুর ছাড়িয়ে কীর্তনখোলাসহ বিভিন্ন নদী পর্যন্ত দখল হয়ে যাচ্ছে। ফলে জলের বাসিন্দা মাছ আর বেঁচে থাকার স্থান খুঁজে পায় না।
মৎস্য অধিদফতরের হিসাব অনুযায়ী এ বিভাগে প্রায় ৪০ হাজার হেক্টর জলাশয় রয়েছে। এরমধ্যে দিঘি, পুকুর ও ডোবা রয়েছে ৮৬ হাজার ২০০টি। এর আয়তন সাড়ে ২৩ হাজার হেক্টর। ৯০০ হেক্টরের লেক রয়েছে ৫টি। এছাড়াও সাড়ে ১৫ হাজার হেক্টর জলাশয়ে দেশি ও ছোট প্রজাতির মাছ বিচরণ করে। ২০০৪-০৫ অর্থবছরে এসব জলাশয় থেকে ১৩ হাজার মেট্রিক টন ছোট প্রজাতির মাছ উৎপাদিত হয়েছে। ২০০৭-০৮ সালে উৎপাদন এসে দাঁড়ায় ৮ হাজার টনে। পরবর্তী বছরগুলোর হিসাব নেই কারো কাছে। হঠাৎ করে দেশি প্রজাতির মাছের উৎপাদন অর্ধেকে নেমে আসার ব্যাপারে মৎস্য বিশেষজ্ঞরা জানান, সুপার সাইক্লোন সিডর ধ্বংস করে দিয়ে গেছে গোটা দক্ষিণাঞ্চলের দেশি প্রজাতির মাছ। মৎস্য কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দেশি মৎস্য সম্পদকে বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা করতে কয়েকটি জেলার পুকুরে বিজ্ঞানভিত্তিক মাছ চাষের প্রকল্প চালু করা হয়েছে। এতে করে বদ্ধ জলাশয়ে দেশীয় প্রজাতির ছোট মাছ বিলুপ্তির হাত থেকে কিছুটা হলেও রক্ষা পাবে। তবে চৈত্র-বৈশাখ মাসে ডিমওয়ালা মাছ নিধন বন্ধ রাখতে কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে বলেও তারা উল্লেখ করেন।
পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর প্রফেসর ড. মো. শামসুদ্দীন বলেন, চলতি গবেষণায় দেখা গেছে, এখন পর্যন্ত প্রায় ৩০ প্রজাতির দেশি মাছ বিলুপ্ত হয়ে গেছে। তিনি আরো বলেন, আগে ৫ প্রজাতির চান্দা মাছ পাওয়া যেতো। এখন পাওয়া যায় ৪ প্রজাতির। ১২ প্রজাতির পুঁটির মধ্যে এখন ১ প্রজাতি পাওয়া যায় না। এছাড়া নান্দিল, তিলা শোলসহ অনেক প্রজাতির মাছ এখন বিলুপ্ত হয়ে গেছে। তিনি বলেন, বিভিন্ন কারণে দেশীয় প্রজাতির এসব মাছ বিলুপ্ত হচ্ছে। প্রাকৃতিক কারণ ছাড়াও, নদীর সঙ্গে বিলের সংযোগ স্থাপনকারী ক্যানেলগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়া, দেদারসে বিদেশি মাছ চাষ, জমিতে বিভিন্ন ক্ষতিকর রাসায়নিক দ্রব্য ব্যবহার করায় বৃষ্টির পানির সঙ্গে ওইসব দ্রব্য নদীতে গিয়ে দেশি মাছে পচন ধরে মরে যাওয়ায় বংশ বিস্তার কমে গেছে। এছাড়াও বিদেশি বিভিন্ন মাছ চাষের ফলেও দেশি জাতের এসব মাছ বিলুপ্ত হচ্ছে।