সোমবার, 06 জুলাই 2015 11:05

হিমায়িত মৎস্য খাতের নগদ সহায়তা লুট

যুগান্তর ।। হিমায়িত চিংড়ি ও মাছ রফতানিতে অতিরিক্ত বরফ মিশিয়ে ওজন বাড়িয়ে হাতিয়ে নেয়া হচ্ছে নগদ সহায়তা। একইভাবে প্যাকেটের মূল্য বৃদ্ধি করেও সরকারের অর্থ লুটপাট করা হচ্ছে। রফতানি আদেশেই এই চোরাপথ তৈরি হয়েছে। এই সুযোগ নিয়ে এক শ্রেণীর ব্যবসায়ী দীর্ঘ দিন অনিয়ম করছে। এসব অনিয়ম ও দুর্নীতি দূর করতে সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয়ের মনিটরিং সেলে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ওই বৈঠকের কার্যবিবরণী থেকে পাওয়া গেছে এ তথ্য।
জানা গেছে, হিমায়িত চিংড়ি ও মাছ রফতানি খাতে ২০১০-১৪ এই চার অর্থ বছরে ১১৬২ কোটি টাকার নগদ সহায়তা দেয়া হয়েছে। বিপুল পরিমাণ এই নগদ সহায়তা দেয়া হলেও এ নিয়ে দীর্ঘ দিন কারচুপি চলছে।
হিমায়িত চিংড়ি ও মাছ রফতানিতে অতিমাত্রায় বরফ দেয়ার বিষয় নিয়ে স্থানীয় ও রাজস্ব অডিট অধিদফতরও আপত্তি দিয়েছে। আপত্তিতে বলা হয়, নিট মাছের ওজনের পরিবর্তে অনিয়মিতভাবে বরফ দিয়ে ওজন বাড়ানো হচ্ছে। ওজন বাড়িয়ে নগদ সহায়তা আদায় করা হচ্ছে। এছাড়া মাছ রফতানির খুচরা মূল্যের প্যাকেট ৫ পাউন্ডের বেশি নির্ধারণ না করার বিধান রয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ৫ পাউন্ডের বেশি মূল্য নির্ধারণ করেও অর্থ হাতিয়ে নেয়া হচ্ছে।
নগদ সহায়তার এই অস্বচ্ছতার বিষয়টি জানানো হয় ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগকে। সেখান থেকে চিংড়ি ও মাছে বরফ মেশানোর পরিমাণ পুনর্নির্ধারণ করতে মতামত দেয়া হয়। এই মতামতের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ ব্যাংক একটি মতামত চেয়েছে মৎস্য অধিদফতরের কাছে। মতামতে ওই অধিদফতর থেকে জানানো হয়, হিমায়িত চিংড়ি রফতানির ক্ষেত্রে বরফ মেশানোর পরিমাণ সর্বোচ্চ ৫৫ ও সর্বনিু ৫ শতাংশ। অন্যান্য মাছের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৩০ এবং সর্বনিু ৫ শতাংশ দেয়া যেতে পারে। এর ভিত্তিতে মনিটরিং সেল নতুন একটি নগদ সহায়তা প্রদানের কাঠামো প্রস্তাব করেছে।
ওই কাঠামোতে উল্লেখ করা হয়, রফতানির সময় হিমায়িত চিংড়ি মাছের সঙ্গে ২০ শতাংশ বরফ মেশানো হলে নগদ সহায়তা দেয়া হবে ১০ শতাংশ। বরফের পরিমাণ ২০ থেকে ৩০ শতাংশ হলে নগদ সহায়তা দেয়া হবে ৯ শতাংশ। বরফের পরিমাণ আরও বেশি হলে অর্থাৎ বরফের পরিমাণ ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ হলে সহায়তার হার হবে ৮ শতাংশ এবং ৪০ শতাংশের বেশি বরফ মেশানোর ক্ষেত্রে নগদ সহায়তার পরিমাণ হবে ৭ শতাংশ।
একইভাবে মাছ রফতানির ক্ষেত্রে নগদ সহায়তার কাঠামো পুনর্নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়। সেক্ষেত্রে ২০ শতাংশ পর্যন্ত বরফ মেশানো মাছের ক্ষেত্রে নগদ সহায়তার হার হবে ৫ শতাংশ। ২০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বরফ মেশানো মাছের ক্ষেত্রে নগদ সহায়তার পরিমাণ হবে ৪ শতাংশ। ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ বরফ মেশানো মাছে সহায়তার হার হবে ৩ শতাংশ এবং ৪০ শতাংশের ওপরে বরফ মিশ্রিত মাছ রফতানিতে নগদ সহায়তার হার হবে ২ শতাংশ। তবে ভোক্তা পর্যায়ে খুচরা প্যাকে চিংড়ি ও অন্যান্য মাছ রফতানির ক্ষেত্রে বিদ্যমান অবস্থা বহাল থাকবে। অর্থাৎ খুচরা রফতানি প্যাকেট হবে ৫ পাউন্ড ওজনের।
জানা গেছে, হিমায়িত চিংড়ি ও মাছ রফতানির নগদ সহায়তা প্রদানের জন্য প্রথমে এলসির আওতায় রফতানি মূল্যের ওপর নগদ সহায়তা দেয়া হয়। কিন্তু দেখা গেছে, মূল্য ঘোষণার ক্ষেত্রে ওভার ইনভয়েসিং করে নগদ সহায়তার অর্থ হাতিয়ে নেয়া হয়। এ প্রেক্ষাপটে ২০০৩ সালে কেন্দ্রীয় ব্যাংক একটি নীতিমালা জারি করে। ওই নীতিমালায় রফতানিকৃত মাছে প্রতি ইউনিটির একটি সর্বোচ্চ এফওবি মূল্য নির্ধারণ করে দেয়া হয়। এক্ষেত্রে হিমায়িত চিংড়ির ইউনিটির এফওবি মূল্য হচ্ছে ৩ দশমিক ৭৯ মার্কিন ডলার এবং অন্যান্য মাছের ১ দশমিক ১০ ডলার। পাশাপাশি ভোক্তা পর্যায়ে প্রতিটি রফতানিকৃত মাছের ইউনিটির মূল্য ৫ পাউন্ড নির্ধারণ করে দেয়া হয়।
এই এফওবি মূল্যের দরে নগদ সহায়তা দেয়া হয়। কিন্তু এই নীতিমালায় বরফের পরিমাণের বিষয়ে দিকনির্দেশান দেয়া হয়নি। শুধু রফতানি আয়কে গণ্য করা হয়। যে কারণে অসাধু ব্যবসায়ীরা এই সুযোগ নিয়ে বেশি পরিমাণ বরফ মিশিয়ে রফতানি করে। সেখানে ওজন বাড়িয়ে নগদ সহায়তা হাতিয়ে নেয়া হয়।
জানা গেছে, ২০১৩-১৪ অর্থ বছরে হিমায়িত চিংড়ি ও মাছ রফতানি খাতে নগদ সহায়তা দেয়া হয় ২৫২ কোটি ২২ লাখ টাকা। এর আগের বছরে অর্থাৎ ২০১২-১৩ অর্থবছরে এ খাতে নগদ সহায়তার পরিমাণ ছিল ২৮০ কোটি ২৬ লাখ টাকা এবং এর আগের বছরে দেয়া হয় ৩২২ কোটি ৩২ লাখ টাকা। ২০১০-১১ অর্থবছরে এ খাতে নগদ সহায়তার পরিমাণ ছিল ৩০৭ কোটি ৫ লাখ টাকা।