মঙ্গলবার, 28 জুলাই 2015 16:04

হুমকিতে প্রাণিসম্পদ খাতের বিনিয়োগ

দৈনিক যুগান্তর ।। প্রান্তিক পর্যায়ে সুষ্ঠু পশু স্বাস্থ্যসেবার অভাবে হুমকিতে রয়েছে এ খাতের ১০ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ। সরকারি হিসাব অনুসারে গ্রামাঞ্চলে গরু, মহিষ, ছাগল ও ভেড়া লালন-পালনে এ পরিমাণ বিনিয়োগ হয়ে থাকে। যা দেশের পুষ্টি ও আমিষের চাহিদা পূরণের সঙ্গে সঙ্গে দারিদ্র্য নিরসনে ভূমিকা রাখছে। কিন্তু ব্যক্তি পর্যায়ে গবাদিপশু পালনে ওষুধ ও চিকিৎসা প্রাপ্তির নিশ্চয়তা নেই বললেই চলে। কেননা সরকারিভাবে গ্রাম ও ইউনিয়ন পর্যায়ে কোনো সেবা কেন্দ্র নেই, উপজেলা লেভেলে একটি করে প্রাণিসম্পদ দফতরের অফিস থাকলেও যথেষ্ট লোকবল নেই। এ অবস্থায় পশু স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে প্রাণিসম্পদ অফিসগুলোকে উপজেলা, গ্রাম পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার বিকল্প নেই বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে ব্র্যাকসহ অন্যান্য বেসরকারি সংস্থার সহযোগিতায় ইউনিয়ন পর্যায়ে পশু স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০১৪ সালের মে পর্যন্ত হিসাব অনুসারে, দেশে মোট গরু রয়েছে ২ কোটি ৮৫ লাখ ৯৯ হাজার ৭৯৯টি। মোট মহিষের সংখ্যা ৬২ লাখ ৩ হাজার ৩৮৩টি। ছাগল রয়েছে ১ কোটি ৯৪ লাখ ৩৫ হাজার ৬১৭টি ও মোট ভেড়ার সংখ্যা ১৫ লাখ ৪ হাজার ৮১১টি। খানা ও খামারে পালিত হয় এসব পশু। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে পারলে এসব গবাদিপশু পালনের সংখ্যা দ্বিগুণ করা সম্ভব। কেননা সাধারণ মানুষের জন্য এটি একটি ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগের খাত। গবাদিপশুর সেবা প্রাপ্তি এখনও চরম অনিশ্চিত।
এ প্রসঙ্গে ব্র্যাকের নির্বাহী পরিষদের উপদেষ্টা মাহবুব হোসেন বলেন, ব্র্যাকের অতিদরিদ্র হ্রাসকরণ প্রকল্পের আওতায় স্থানীয়দের সহযোগিতা প্রান্তিক পর্যায়ে হতদরিদ্রদের খুঁজে বের করা হয়। এরপর এদের বিভিন্ন প্যাকেজের আওতায় পশুসম্পদ অনুদান হিসেবে প্রদান করা হয়। এরপরও এসব পশুসম্পদের রক্ষণাবেক্ষণ ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে নিবিড় পর্যবেক্ষণ করেন ব্র্যাকের মাঠপর্যায়ের কর্মীরা। একই সঙ্গে সরকারের পশুসম্পদ অধিদফতরের সেবাসমূহ মাঠপর্যায়ে পৌঁছে দিতেও ব্র্যাক কাজ করে আসছে।
জানা গেছে, প্রান্তিক পর্যায়ে গবাদিপশুর চিকিৎসাসেবা নিশ্চিতে লোকবলের প্রবল সংকট রয়েছে। এ অবস্থায় গ্রামীণ পর্যায়ে পশুসেবা পৌঁছে দিতে ব্র্যাকের অ্যাডভোকেসি ফর সোশ্যাল চেঞ্জ কাজ করছে। ব্র্যাক দুর্গম ও প্রান্তিক পর্যায়ে সেবা পৌঁছে দিতে জেলা ও উপজেলা পশুসম্পদ দফতরের সঙ্গে কাজ করে থাকে। অ্যাডভোকেসির উদ্যোগে গ্রামে গ্রামে ভ্যাক্সিনেশন ক্যাম্পেইনের ব্যবস্থা করে। ফলে প্রত্যন্ত অঞ্চলের সাধারণ মানুষ গবাদিপশুর চিকিৎসা, ওষুধ ও সরকারি সেবাসমূহ খুব সহজেই পেয়ে যায়।
এ প্রসঙ্গে নওগাঁ উপজেলা প্রাণিসম্পদ দফতরের কর্মকর্তা শামিম নাহার বলেন, পশু চিকিৎসাসেবা দিতে সরকারি উদ্যোগে উপজেলা পর্যায়ে একটি করে অফিস রয়েছে। নিয়ম অনুসারে এ অফিসগুলোতে একজন লাইভস্টক, একজন ভ্যাটেরিনারি অফিসার, একজন এফএএআই (প্রজনন) কর্মকর্তা ও মাঠপর্যায়ে তিনজন কর্মী থাকার কথা। কিন্তু দেশের বেশিরভাগ অফিসে এসব পদ খালি রয়েছে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, পশুসেবা নিশ্চিত করতে হলে এ অফিসগুলোকে ডিসেন্ট্রালাইজেশন করা দরকার। তবে উপজেলা অফিসগুলো বর্তমানে বেসরকারি সংস্থাগুলোর সহযোগিতায় গ্রামে সেবা পৌঁছে দেয়ার চেষ্ট করছে।
সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে গিয়ে দেখা গেছে, ব্র্যাকের অ্যাডভোকেসি ফর সোশ্যাল চেঞ্জ নওগাঁ জেলায় ২০১৪ সালে ১৯টি ক্যাম্পেইনের ব্যবস্থা করেছে। যেখানে ১ হাজার ৬১২ জন অতিদরিদ্র আড়াই হাজার গরু, দেড় হাজার ছাগল ও ৫০০ শতাধিক মুরগির চিকিৎসা নিতে পেরেছেন। যাতায়াত সমস্যা ও চিকিৎসা ব্যয়ের কথা চিন্তা করে অনেকে এসব গুরু-ছাগল উপজেলা পর্যায়ে নিয়ে যেত না।
এ প্রসঙ্গে নওগাঁর অ্যাডভোকেসি কর্মকর্তা শেখ আবদুল করিম বলেন, এসব ক্যাম্পেইনের কারণে একদিকে ব্র্যাকের অতিদরিদ্র নিরসনে লাইভস্টক প্রকল্পের সুবিধাগ্রহীতারা তাদের পশুর চিকিৎসা করাতে পারছেন। অন্যদিকে গ্রামের অন্যরাও এ সুযোগকে কাজে লাগাতে পারছেন। দেশের দুর্গম অঞ্চলে এ পদ্ধতিতে চিকিৎসাসেবা দেয়া গেলে গবাদিপশুর স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা সম্ভব বলে জানান তিনি।