মঙ্গলবার, 17 অক্টোবর 2017 12:16

এক দশকে বোরোর উৎপাদন সর্বনিম্ন?

এক দশকের মধ্যে এই প্রথম চাল নিয়ে বড় ধরনের সংকটে বাংলাদেশ। এর সুলুক সন্ধানে চার পর্বের ধারাবাহিক প্রতিবেদন পর্ব-১

বণিক বার্তা || বোরো তোলা শেষ হয়েছে প্রায় তিন মাস আগে। আউশ ধান কাটাও শেষ। আগাম আমন কাটাও শুরু হয়েছে দেশের কোথাও কোথাও। অথচ বোরো উৎপাদনের হিসাব এখনো চূড়ান্ত করতে পারেনি বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)। সংস্থাটির কাছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই) তাদের প্রাথমিক প্রতিবেদন জমা দিলেও তথ্য নিয়ে চলছে হিসাব-নিকাশ। দেশে মোট চালের বড় অংশ আসে বোরো থেকে। তবে বোরোর উৎপাদন এবার কম হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগ (ইউএসডিএ)। সংস্থাটি বলছে, গত অর্থবছরের তুলনায় চলতি অর্থবছর বোরোর উৎপাদন সাড়ে ১১ লাখ টনের বেশি কমতে পারে। ইউএসডিএর পূর্বাভাস যদি বিবেচনায় নেয়া হয়, তাহলেও এবার বোরো চাল উৎপাদন ১ কোটি ৭৮ লাখ টনের বেশি হবে না। তবে সরকারের সূত্রগুলো বলছে, দুই দফা বন্যা ও ব্লাস্ট রোগের কারণে এ বছর বোরোর উৎপাদন ২০-২২ লাখ টন কম হবে। বিশ্ব খাদ্য দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এক জাতীয় সেমিনারেও একই ধরনের তথ্যের বার্তা দিয়েছেন সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। এ তথ্য হিসাবে নিলে বোরোর উৎপাদন এবার ১ কোটি ৭০ লাখ টনের নিচে থাকবে। সে হিসাবে গত এক দশকে এটাই হবে বোরোর সর্বনিম্ন উৎপাদন।

বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৭-০৮ অর্থবছর বোরো চাল উৎপাদন হয়েছিল ১ কোটি ৭৭ লাখ টন। কিন্তু ওই অর্থবছর সিডরের মতো বড় ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখে পড়ে দেশের কৃষি। কৃষি সম্প্রসারণ অধিপ্তরের হিসাবে, সে বছর আট লাখ টন আমন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবে আবাদি জমির যে ক্ষতি হয়, তাতে বোরোর প্রস্তুতিও সেভাবে নিতে পারেননি কৃষক। এর পরের অর্থবছর দেশে বোরো চাল উৎপাদন হয় ১ কোটি ৭৮ লাখ ৯ হাজার টন।

আর গত অর্থবছর ৪৮ লাখ হেক্টর জমিতে ১ কোটি ৯০ লাখ ৫৮ হাজার টন বোরো চাল উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু ধান কাটার ঠিক তিন সপ্তাহ আগে হাওড় অঞ্চলের প্রায় চার লাখ হেক্টর জমির বোরো ক্ষেত ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এছাড়া উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলের বেশকিছু জেলায় ফাঙ্গির (নেক ব্লাস্ট) আক্রমণ ধানের হেক্টরপ্রতি ফলন কমিয়ে দিয়েছে, যা মোট উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। তবে এটি সাময়িক সংকট তৈরি করেছে বলে জানান কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী। গতকাল বিশ্ব খাদ্য দিবসের সেমিনারে কৃষিমন্ত্রী বলেন, চাল উৎপাদন ও চাহিদায় কয়েক বছর ধরেই আমরা স্বয়ংসম্পূর্ণতা দেখিয়েছি। কিছু কিছু সময় উদ্বৃত্তও হয়েছে। চাল রফতানি করা হয়েছে দুটি দেশে। স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের যে অগ্রযাত্রায় আমরা ছিলাম, তা বন্যা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে সাময়িকভাবে বিঘ্নিত হয়েছে। তবে তা অচিরেই কাটিয়ে উঠব। কারণ বাংলাদেশের মানুষের সংকট মোকাবেলা করে সফলভাবে ফিরে আসার গৌরবান্বিত ঐতিহ্য রয়েছে।

এরই মধ্যে চাল উৎপাদন কমার প্রভাব পড়েছে চালের বাজারে। মোটা ও চিকন চালের দাম রেকর্ড পরিমাণ বেড়েছে। ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্য অনুযায়ী গতকালও খুচরায় চিকন চাল বিক্রি হয় প্রতি কেজি ৬০-৬৬ টাকায়। আর মোটা চাল বিক্রি হয় ৪৪-৪৮ টাকা কেজি দরে। বাজার স্বাভাবিক রাখতে আমদানি করতে হয়েছে বিপুল পরিমাণ চাল। চাল আমদানিতে এখন এশিয়ার অন্যতম দেশে পরিণত হয়েছে বাংলাদেশ। এক বছরের ব্যবধানে চাল রফতানিকারক দেশ থেকে বড় আমদানিকারক দেশে পরিণত হয়েছে।

বন্যা ও হাওড় অঞ্চলে দুর্যোগের কারণে চাল উৎপাদনের সঠিক তথ্য ও পূর্বাভাস পাওয়া গেলে এ ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হতো না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশ্ব খাদ্য দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এক জাতীয় সেমিনারে কৃষি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য মো. আবদুল মান্নান বলেন, আমাদের মধ্যে চালের উৎপাদন বাড়িয়ে দেখানোর প্রবণতা রয়েছে। সঠিক তথ্য ও সময়মতো আমদানি করা গেলে দেশের বর্তমান সংকট দীর্ঘ হতো না। চাল উৎপাদনে প্রবৃদ্ধির করুণ দশার বিষয়ে তিনি মতামত দেন। চাল উৎপাদনে প্রবৃদ্ধি না হওয়ার পেছনে উন্নত ধানের জাতের অভাবকে দায়ী করেন তিনি।

এ বছর বোরোর উৎপাদন যতটুকুই কমুক, তা হবে রেকর্ড। কারণ গত তিন দশকে পরপর দুই বছর বোরো উৎপাদন কখনই কমেনি। ২০১৫-১৬ অর্থবছর বোরো উৎপাদন ২ লাখ ৫৪ হাজার টন কম হয়েছিল। বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে দেশে বোরোর উৎপাদন ছিল ১ কোটি ৯১ লাখ ৯২ হাজার টন। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়ায় ১ কোটি ৮৯ লাখ ৩৭ হাজার টনে। দেশে চালের ফলন প্রবৃদ্ধিও কমে আসছে। ইন্টারন্যাশনাল ফুড পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (ইফপ্রি) তথ্য বলছে, ১৯৯৬-৯৭ থেকে ২০০৫-০৬ এই ১০ বছরের তুলনায় পরের ১০ অর্থবছরে (২০০৬-০৭ থেকে ২০১৫-১৬) ফলন প্রবৃদ্ধি অর্ধেকে নেমেছে। তবে চাল উৎপাদন বৃদ্ধির হার দ্রুত বাড়াতে কার্যকর উদ্যোগের অভাব দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, চালের চাহিদা মেটাতে উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর বিকল্প নেই। আর উন্নত ব্রিডিং ও ব্যবস্থাপনায় জোর না দিলে ফলন বাড়ানো সম্ভব নয়। উদ্ভাবিত বিভিন্ন জাত গবেষণা পর্যায়ে সাত-আট টন ফলন দিলেও মাঠপর্যায়ে দিচ্ছে পাঁচ-ছয় টন। তাই এ ধরনের ফলন পার্থক্য কমানোর জন্য ব্যবস্থাপনায় জোর দিতে হবে। তা না হলে ছোটখাটো দুর্যোগেও সংকটে পড়তে হবে।

ইফপ্রির কান্ট্রি ডিরেক্টর ড. আকতার আহমেদ এ প্রসঙ্গে বলেন, বাংলাদেশের আবাদযোগ্য জমির অন্যতম বৈশিষ্ট্যই হলো, এখনো জমিতে প্রযুক্তি যথাযোগ্য ব্যবহার হয়নি। ফলে গত এক দশকে কৃষিতে প্রবৃদ্ধি কমছে। এর অন্যতম কারণ ধান উৎপাদনে প্রবৃদ্ধি কমে যাচ্ছে। গ্রামাঞ্চলের মোট কৃষকের এক-তৃতীয়াংশ প্রান্তিক, যাদের নিজস্ব জমি নেই। বেশির ভাগ কৃষকই স্বল্পশিক্ষিত ও প্রযুক্তি ব্যবহারে অনভিজ্ঞ। তাই কৃষিপ্রযুক্তি ব্যবহারে তাদের পর্যাপ্ত প্রবেশগম্যতা নেই। ধানের উৎপাদনশীলতা বাড়াতে এসব কৃষকের কাছে প্রযুক্তি যেমন পৌঁছাতে হবে, তেমনি উন্নত জাত ও উপকরণসহায়তা দ্রুত দিতে হবে। পাশাপাশি বিপণন ও ব্যবস্থাপনা জোরদার করতে হবে।