মঙ্গলবার, 07 এপ্রিল 2015 00:00

নারীরা দুঃখের আগুনে দাহ হচ্ছেন ! মজুরীতে বৈষম্য : কৃষিতে নেই স্বীকৃতি!

দৈনিক ইনকিলাব || বিশ্বের যা-কিছু মহান সৃষ্টি চির কল্যানকর, অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর- জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম এর কথাটি এখন বাস্তবে রূপ নিয়েছে। বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা ও নারীর অগ্রযাত্রা এক অর্থে সমার্থক । হাতে গোনা যে কয়টি কারনে ৪৪ বছর বয়সী স্বল্পায়তনের এই দেশটি বিশ্ববাসীর বিস্ময়মুগ্ধ মনোযোগ আকর্ষন করেছে- তন্মধ্যে নারীর ক্ষমতায়ন নিঃসন্দেহে অন্যতম। সীমিত সম্পদ ও সীমাহীন বাধা বিপত্তি সত্ত্বেও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের যে ধারাবাহিক অগ্রগতি দেশি-বিদেশি উন্নয়ন বিশেষজ্ঞদের বিস্ময়ের কারন হয়ে দাঁড়িয়েছে- সেখানেও নারীর অবদান বিশেষ ভাবে উল্লেখ্যযোগ্য। অর্থনীতির অন্যতম প্রধান খাত পোষাক শিল্পে নারীর একচ্ছত্র ভূমিকার বিষয়টি সুবিদিত। যে ক্ষুদ্রখাতের অভাবনীয় সাফল্য বাংলাদেশকে নোবেল পুরস্কারসহ বিশ্বখ্যাতি এনে দিয়েছে-তার মূলেও রয়েছে নারী। এমন কি প্রবাসী কর্মীরা আমাদের অর্থনীতিতে নিরন্তর যে মূল্যবান রক্ত সঞ্চালন করে চলেছে- সে সব ক্ষেত্রেও নারীর অবদান স্পষ্ট হয়ে উঠছে। তবে নারীর সাম্প্রতিক এসব অর্জন ও অবদানের কথা বলতে গিয়ে অনেকেই ভূলে যান যে, আবাহমান কাল ধরে বাংলার নারী সমাজ ও অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে আসছে। বিশেষ করে সকল দুর্যোগে-দুর্বিপাকে যুগ যুগ ধরে যা আমাদের অর্থনীতিকে বেঁচে রেখেছে-সেই কৃষিখাতে পুরুষের পাশাপাশি নারীর অপরিসীম অবদানের বিষয়টি সর্বজনবিদিত।

সাম্প্রতিক বৎসরগুলোতে নারীর এই অগ্রযাত্রার যে নতুন মাত্রা যুক্ত হয়ে চলেছে-তাও অস্বীকার করার উপায় নেই। রাজনীতিতে নারীর ক্রমবর্ধমান ভূমিকা লয়ে কেউ কেউ হয়তো কিছুটা তর্ক তুলতে পারেন। তবে বেসামরিক ও সামরিক প্রশাসন, বিচার বিভাগ এবং শিক্ষাসহ ক্রীড়া সহ প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে নারীর যে দৃপ্ত পদচারন্য লক্ষ্য করা যাচ্ছে এটা যে তাদের স্বোপার্জিত তা লয়ে তর্কের কোন অবকাশ নেই। অথচ অন্য অনেক অবদানের মতো নারীর এ নিভৃত ভূমিকাও কোথাও যথাযথ ভাবে স্বীকৃত হয়নি। কেন হয়নি সংশ্লিষ্ট নীতি নির্ধারক ও বিশেষজ্ঞরাই তা ভালো বলতে পারবেন, তাই নারীরা মজুরীতে বৈষম্য ও কৃষিতে স্বীকৃতি না পাবার দুঃখের আগুনে দাহ হচ্ছেন। পুরুষ শ্রমিকদের তুলনায় বেশী কাজ করেও মজুরি বৈষম্যের শিকার হচ্ছে নারী শ্রমিকরা। অপরদিকে সিংহভাগ কৃষি কাজে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ নারীরা জড়িত থাকলেও কৃষক হিসেবে স্বীকৃতি মেলেনি তাদের। প্রাচীনকাল থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত গৃহস্থালী কাজের পাশাপাশি নারী কৃষিকাজ করে আসছে। গ্রামীন নারীরা বীজ বপন থেকে শুরু করে জমিতে সার দেওয়া, আগাছা দমন, কীটনাশক ছিটানো, ধান কাটা, ধান থেকে চাল পাওয়ার প্রক্রিয়া পর্যন্ত বিভিন্ন গুরুত্ব পুর্ণ কৃষি কাজে জড়িত। এমনকি শহরের নারীরা বাড়ির ছাদে ও বাগানে শাক সব্জি ও ফলের চাষ করে। আর বাংলাদেশের চা উৎপাদনে উল্লেখ্য যোগ্যসংখ্যক নারী শ্রমিকের অবদান গুরুত্ব পুর্ণ। এছাড়া মাছ চাষ, গরু-ছাগল প্রতিপালন, হাস-মুরগি ও কবুতর দেখাশোনাও নারীরা শ্রম দিয়ে যাচ্ছে। নারী শ্রমিকের মধ্যে ৭০ শতাংশ কৃষি কাজের সঙ্গে জড়িত। আর কৃষিকাজের সঙ্গে জড়িত বিভিন্ন উপকরন তৈরির কাজও তারা করে থাকে। যুগযুগ ধরে চলে আসা সামাজিক প্রথানুযায়ী নারী তাদের বাবা, মা, স্বামী,ভাই ও ছেলেকে কৃষিকাজে প্রাত্যহিক কাজের অংশ হিসেবে সাহায্য করে আসছে।, বলাবাহুল্য কৃষিতে পুরুষের অংশগ্রহন ক্রমশ কমছে।

জরিপ মতে, ফসল উৎপাদনে নারীর সক্রিয় অবদান ২৭ভাগ। অথচ কুষি সম্পসারণ অধিদপ্তরে পুরুষ কৃষকের জন্য সুনির্দিষ্ট ‘ডাটাবেজ’ থাকলেও নারী কৃষকের সেটা নেই। ফলে রাষ্ট্রীয় প্রনোদনার অংশ হিসেবে ১কোটি ৩৯লাখ কৃষক কার্ড বিতরন করা হলেও নারীরা এর মধ্যে অর্ন্তভুক্ত হয়নি। এছাড়া ঝড়,বৃষ্টি,খড়াতাপ,রোদ্রে পুড়ে প্রতিদিন ১০/১২ ঘন্টা পাথর ভাঙ্গা, মাটি কাটা সহ শক্ত পরিশ্রমের কাজ করেও মজুরি পাচ্ছে পুরুষের অর্ধেক। প্রতিদিন সূর্য্য উদয় থেকে শুরু করে সুর্য্য অস্তের আগ পর্যন্ত কাজ করে মাত্র ১ ঘন্টা সময় পাচ্ছে দুপুরের খাবারের জন্য। এসব অধিকাংশ নারী শ্রমিকের কাজের জন্য কোন সুষ্ঠ পরিবেশও নেই। রোদ ও বৃষ্টিতে বসার মতো কোন জায়গাও নেই তাদের। নেই টয়লেটের ব্যবস্থা। এমন নারী শ্রমিকদের ছোট ছোট সন্তানদেরও বিশ্রামের কোন সুব্যবস্থা নেই। ফলে মায়ের কোলে ঘুমালেও মাকে কাজ করতেই হয়। কাজে ফাঁকি দেবার প্রবণতা কম থাকায় নারীরা সকল কাজেই প্রাধান্য পাচ্ছে। কৃষিকাজ ও অন্যান্য কাজে নিয়োজিত নারীদের দাবি, নারীকে শ্রম আইনে অর্ন্তভুক্ত করে কৃষক হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে। এতে তারা কৃষি কাজে প্রযোজনায় ব্যাংক ঋন ও কৃষি কার্ড সহ অন্যান্য সুবিধা ভোগ করতে পারবে। গ্রামীন জীবন যাত্রায় স্থায়িত্বশীল উন্নয়নের জন্য প্রচার অভিযান এর ২০১২ সালের এক প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, দেশের মোট নারী শ্রম শক্তির পরিমান ১কোটি ৬২ লাখ। এর মধ্যে ৭৭শতাংশ গ্রামীন নারী। যার ৬৮শতাংশ কৃষি, পোলটি, বনায়ন ও মৎস্য খাতের সঙ্গে জড়িত। ইতিমধ্যে কর্মজীবি নারী সংগঠনের নেতারা কৃষি শ্রম প্রতিষ্ঠার লক্ষে একটি শ্রম কমিশন গঠনের দাবি জানিয়েছেন। তাদের হিসাব কৃষি খাতের ২০ টি কাজের মধ্যে ১৭টিতেই নারী অংশ গ্রহন করছে। বিশ্ব ব্যাংকের ২০০৮ সালের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, কৃষি খাতে নিয়োজিত পুরুষ চেয়ে নারীর অবদান শতকরা ৬০থেকে ৬৫শতাংশ বেশি। এছাড়া কর্মক্ষম নারীর মধ্যে সবচেয়ে বেশি নিয়োজিত আছে কৃষিকাজে। বাংলাদেশ উন্নযন গবেষনা সংস্থায় (বিআইডিএস ) এক গবেষনা বলছে, গ্রামীন ৪১শতাংশ নারী আলু চাষের সঙ্গে জড়িত। ৪৮ শতাংশ মাছ চাষের সঙ্গে জড়িত। এছাড়া সরকারী ভাবে গৃহিত ‘একটি বাড়ি একটি খামার ’ প্রকল্প থেকে ঋন নিয়েও অনেক নারী তখন কৃষি কাজের সঙ্গে জড়িত। এদিকে নারী নেত্রীদের মতে, আমরা দীর্ঘ দিন ধরে নারীকে কৃষক হিসাবে স্বীকৃতি দেয়ার জন্য সরকারের কাছে দাবি জানিয়ে আসছি। এ জন্য প্রয়োজন নীতি প্রনয়ন। একই সঙ্গে নারীর কৃষক হিসাবে প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষনের ব্যবস্থা করতে হবে। এ বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি করন বাঞ্চনীয় নারীকে কৃষক হিসেবে শস্য বাজার জাত করন থেকে শুরু করে বিপনন কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকার জন্য তৈরি করতে হবে।

নারীকে আরও দক্ষ কৃষক হিসাবে গড়ে তোলার জন্য সরকার ও বেসরকারী ভাবে সহযোগীতা করতে হবে। বলাবাহুল্য নিম্নবিত্ত শ্রেণীর ৮০ ভাগ নারীরা গার্মেন্টস শিল্পে কাজ করে দেশের অর্থনীতিকে গতিময় রাখলেও তাদের বিরুদ্ধে কোন এক মহল থেকে নেতিবাচক উক্তি করা হয়েছে। অথচ তারাই আবার নারীর নান্দনিক সুন্দর্য এবং মা হতে পারার ক্ষমতাকে খুব সাদরে ও সাড়ম্বরে গ্রহণ করে থাকেন যেমন পণ্যের বিজ্ঞাপনে নারী সৌন্দর্যকে ভীষণভাবে গুরুত্ব প্রদান করা হয়ে থাকে। বিয়ের বাজারেও সুন্দরী মেয়েদের কদর অনেক বেশি। অথচ নারীর এই সৌন্দর্য এবং মা হতে পারার ক্ষমতা কারনেই নারীরা বেশি বিপদে পড়ে। মা হতে পারা একটি বিশাল ক্ষমতা- কোনো পুরুষই বিলিয়ন বার স্বাধনা করলেও মা হতে পারবে না। অথচ মা হবার ইতিবাচক শক্তিকে প্রায় সময় নেতিবাচক ভাবে ব্যবহার করা হয়। ধরা যাক কোনো নারী এবং পুরুষের মধ্যে একটি সম্পর্ক স্থাপিত হলো ; নারী অন্ত:সত্ত্বা হয়ে ভোগান্তির শিকার হলেন এবং পুরুষটি গা ঝাড়া দিয়ে পালিয়ে গেল। আবার নিম্ন বিত্ত পরিবারে দেখা যায়, দুই তিনটি সন্তান জন্ম নেবার পর স্বামী নানা ছলে অন্য নারীকে বিয়ে করে। অন্যকিছু নয়, নারীকে যদি মা হতে পারার ক্ষমতার যোগ্য সম্মানটুকু প্রদান করা হয়- তবে আলাদা করে নারী দিবস পালনের বোধ করি প্রয়োজন হবেনা। শত দুঃখ বেদনার মাঝেও দেশের রাষ্ট্রপ্রধান সরকার প্রধান আশার বাণী শুনিয়েছেন। রাষ্ট্রপ্রতি আব্দুল হামিদ নারী দিবসের তার বাণীতে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে নারীর অবদান অপরিসীম উল্লেখ্য করে বলেন, তাদের যোগ্য মর্যাদা প্রদানের পাশাপাশি অধিকার ও ক্ষমতায়ন নিশ্চিতকরণ জরুরী বলেন মন্তব্য করেন। অপরদিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে তার সরকারের কার্যক্রম ও নীতিমালা উল্লেখ্য করে সকলে মিলে নারী মানবাধিকার রক্ষা, ন্যায্য অধিকার প্রাপ্তি, ক্ষমতায়ন ও মর্যাদা নিশ্চিত করে একটি সমাজ ভিত্তিক বিশ্ব গড়ার দৃঢ় অঙ্গিকার ব্যক্ত করেন।

এ বিষয়ে অ্যাকশন এইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টরের ফাবাহ কবীর উল্লেখ করেন, ২০ টির বেশি কৃষি কাজে নারীর অবদান থাকা সত্বেও তাদের কৃষক হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়া হচ্ছে না। এতে এক জন পুরুষ যেসব সুবিধা ভোগ করছে কিষানীরা তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। ফলে এ ক্ষেত্রে বিপুল অবদান থাকা সত্বেও নারী কৃষকেরা অগ্রযাত্রা বাধাগ্রস্থ হচ্ছে। নারীকে কৃষক হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়া এখন সময়ের দাবি। নারী বিশেষজ্ঞদের বিশ্বাস, বাংলাদেশের অগ্রযাত্রার সঙ্গে সমতালে এখন যেমন পুরুষের পাশাপাশি দৃপ্ত পায়ে নারী এগিয়ে যাচ্ছে। ভবিষ্যতে তাদের মজুরী বৈষম্য নারী কৃষক হিসাবে স্বীকৃতি, ভাবাবেগ ও প্রনোদনা, কৃষি কার্ড প্রদন করা হলে ভবিষ্যৎ তা আরও বেগবান হবে। ফলে সার্বিকভাবে দেশে অর্থনীতি চাঙ্গা হবে। হয়ে যাবে সোনার বাংলার মডেল। আর এ দিবসটির প্রতিপাদ্য নারীর ক্ষমতায়ন ও মানবতার উন্নয়ন বাস্তবতা রূপ লাভ করবেই করবে।