বৃহস্পতিবার, 15 অক্টোবর 2015 15:01

কৃষিতে নারীর স্বীকৃতি চাই

আন্তর্জাতিক গ্রামীণ নারী দিবস আজ

কৃষিখাতের ২০টি কাজের মধ্যে ১৭টিই করে নারী

দৈনিক ইত্তেফাক || ‘আমরা নারীরা মাঠে-ঘাটে কাজ করি, উত্পাদন করি; অনেক সময় পুরুষের চেয়েও বেশি কাজ করি; কিন্তু সরকার আমাদের কোন সুযোগ দেয় না। ব্যাংকগুলোও আমাদের ঋণ দেয় না। সুযোগ-সুবিধা পাইলে আমরা গ্রামীণ নারীরাও কৃষি ও উত্পাদনে আরো বেশি অবদান রাখতে পারবো—’ কথাগুলো বলছিলেন ফরিদপুরের নারী কৃষক হাজেরা বেগম।কর্মজীবী নারীর হিসাব মতে, কৃষি খাতের ২০টি কাজের মধ্যে ১৭টি কাজে নারীর অংশগ্রহণ থাকলেও; কৃষিতে নারীর স্বীকৃত নেই। বীজ সংরক্ষণ থেকে শুরু করে ফসল উত্পাদন, সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াজাতকরণে গ্রামীণ নারীর সিংহভাগ অংশগ্রহণ থাকলেও কৃষক হিসেবে তাদের স্বীকৃতি ও মূল্যায়ন হয় না। কৃষিঋণ ও কৃষকের জন্য দেয়া সরকারি সুযোগ-সুবিধাগুলো থেকেও গ্রামীণ নারীরা বঞ্চিত।
‘গ্রামীণ জীবনযাত্রায় স্থায়িত্বশীল উন্নয়নের জন্য প্রচার অভিযান’ এর ২০১২ সালের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, দেশের মোট নারী শ্রম শক্তির পরিমাণ ১ কোটি ৬২ লাখ। এর মধ্যে ৭৭ শতাংশ গ্রামীণ নারী। যার ৬৮ শতাংশ কৃষি কাজে, পোলট্রি, বনায়ন ও মত্স্য খাতের সঙ্গে জড়িত। বিশ্ব ব্যাংকের ২০০৮ সালের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, কৃষি খাতে নিয়োজিত পুরুষের চেয়ে নারীর অবদান ৬০ থেকে ৬৫ শতাংশ বেশি। এছাড়া কর্মক্ষম নারীর মধ্যে সবচেয়ে বেশি নিয়োজিত আছে ‘কৃষি কাজে’। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা সংস্থা (বিআইডিএস)-এর গবেষণায় বলা হয়েছে— গ্রামীণ ৪১ শতাংশ নারী আলু চাষের সঙ্গে জড়িত। ৪৮ শতাংশ মাছ চাষের সঙ্গে জড়িত। গ্রামীণ নারীকে নিয়ে কাজ করা সংগঠনের নেতৃবৃন্দ বলেন, দেশের বিশ্বখ্যাতি অর্জনের পেছনে আজকের গ্রামীণ নারীর ব্যাপক অর্জন থাকলেও তা স্বীকার করা হয় না। শুধু কৃষক হিসেবে নন; গার্মেন্টস সেক্টরে নারীকর্মী, প্রবাসে নারীকর্মী দেশের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করছে। নারীর এসব অর্জন কেবল সাম্প্রতিক কালেই নয়; আবহমান কাল ধরে দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে। অথচ এই নারীরাই মজুরি বৈষম্য ও কাজের স্বীকৃতি না পাওয়ার বঞ্চনার শিকার।
এ পরিস্থিতিতে বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আজ বাংলাদেশেও আন্তর্জাতিক গ্রামীণ নারী দিবস পালিত হচ্ছে। জাতীয়ভাবে গ্রামীণ নারী দিবস-২০১৫-এর প্রতিপাদ্য নির্ধারণ হয়েছে— ‘খাদ্য নিরাপত্তায় গ্রামীণ নারীর অবদানের স্বীকৃতি দাও’। নারী শ্রমিকদের মজুরি বৈষম্য, কৃষক হিসাবে স্বীকৃতি, কৃষি কার্ড প্রদান, সরকারি প্রণোদনা দেয়া হলে সমাজে ও দেশের জন্য তারা ব্যাপক ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে। গ্রামীণ নারী কৃষকদের উত্সাহিত করতে এই দিবসটি সরকারিভাবে পালন করার আহ্বান জানান নেতৃবৃন্দ। কর্মজীবী নারীর প্রোগ্রাম পরিচালক সানজিদা সুলতানা বলেন, এত অধিকসংখ্যক নারী গ্রামীণ কৃষিতে কাজ করলেও এখনো সরকারিভাবে এই দিবসটি পালন করা হয় না। নারীদের নিয়ে কাজ করা বেসরকারি সংগঠনগুলোই কেবল এই দিবসটি পালন করে থাকে। তিনি গ্রামীণ নারী কৃষকদের উত্সাহিত করতে এই দিবসটি সরকারিভাবে পালনের আহ্বান জানান। নারী নেত্রীরা বলেন, দীর্ঘদিন ধরে নারীকে কৃষক হিসাবে স্বীকৃতি দেয়ার জন্য সরকারের কাছে দাবি জানিয়ে আসছি। এ জন্য প্রয়োজন নীতি প্রণয়ন। নারীকে দক্ষ কৃষক হিসাবে গড়ে তোলার জন্য সরকারি ও বেসরকারিভাবে সহযোগিতা করতে হবে। এ বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে নারীকে কৃষক হিসেবে শস্য বাজারজাতকরণ থেকে শুরু করে বিপণন কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকার জন্য তৈরি করতে হবে।
গ্রামীণ নারীকে কৃষক হিসাবে স্বীকৃতি দেয়া সময়ের দাবি উল্লেখ করে একশন এইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ কবীর বলেন, ২০টির বেশি কৃষিকাজে নারীর অবদান থাকলেও কৃষক হিসাবে তার স্বীকৃতি মিলছে না। একজন পুরুষ কৃষক যেসব সুবিধা ভোগ করছে কিষাণীরা তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। ফলে কৃষিক্ষেত্রে বিপুল অবদান থাকা সত্ত্বেও নারী কৃষকের অগ্রযাত্রা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরে পুরুষ কৃষকের জন্য সুনির্দিষ্ট ‘ডাটাবেজ’ থাকলেও নারী কৃষকের জন্য কোন ‘ডাটাবেজ’ নেই। ফলে রাষ্ট্রীয় প্রণোদনার অংশ হিসেবে ১ কোটি ৩৯ লাখ কৃষককে কার্ড বিতরণ করলেও নারীরা এর অন্তর্ভুক্ত হয়নি। তাছাড়া রোদ-বৃষ্টি, ঝড়ে প্রতিদিন ১০/১২ ঘণ্টা মাটিকাটা, পাথর ভাঙার মতো কঠিন কাজ করলেও মজুরি পান পুরুষের অর্ধেক। এসব শ্রমিক সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত কাজ করে দুপুরে খাবার সময় পান মাত্র ১ ঘণ্টা। অধিকাংশ নারী শ্রমিকের কাজের জন্য কোনো সুষ্ঠু পরিবেশও নেই। তাদের জন্য নেই পয়ঃনিষ্কাশনের ব্যবস্থা। এমনকি নারী শ্রমিকের ছোট সন্তানের জন্য নেই মাতৃদুগ্ধ পানের বা ডে-কেয়ার সেন্টারেরও কোনো ব্যবস্থা। কৃষিকাজ ও অন্যান্য কাজে নিয়োজিত নারীর দাবি, নারীকে শ্রম আইনে অন্তর্ভুক্ত করে কৃষক হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে। এতে তারা কৃষিকাজে প্রয়োজনীয় ব্যাংক ঋণ ও কৃষি কার্ডসহ অন্যান্য সুবিধা ভোগ করতে পারবে।